ক্লাউড কম্পিউটিং কি

একাদশ শ্রেণীতে পড়ার সময় সম্ভাবতার অংক করতে যেয়ে, অংকের থেকে বেশী সমস্যা হয়েছে কার্ডের হিসাব নিকাশ বুঝতে। এর আগে জানতামই না মোট কার্ডের সংখ্যাই বা কত , কোন ধরণের কার্ডই বা কত। ভার্সিটিতে পড়ার সময় বিদেশী লেখকদের বই পড়ার সময় তাদের উদাহরন গুলি বুঝতেও বেগ পেতে হয়েছে, কারন সেগুলির সাথে আমাদের কালচারের মিল না থাকায়। তখন ভাবতাম বইয়ের উদাহরন গুলি যদি আমাদের সমাজ বা বাস্তবতার আলোকে হত তাহলে কতই না ভালো হত। সেটা করা কি খুব কঠিন কিছু ? সেই প্রশ্নের উত্তর খুজতেই প্রযুক্তির একটা বিষয় নিয়ে আজকের এই লেখাটা। যেখানে উদাহরন গুলি থাকছে আমাদের চেনা-জানা ।বর্তমানে প্রযুক্তিবিদদের কাছে ক্লাউড কম্পিউটিং শব্দটা একবারে খবই পরিচিত। ইংরেজীতে যাকে বলে বাজওয়ার্ড। যার বোধগম্য সহজ বাংলা হতে পারে চায়ের টেবিলের আড্ডার টপিকের মত। সেই ক্লাউড নিয়েই আজকের এই লেখা।ক্লাউড সম্পর্কে বলতে গেলে শুরু করতে হবে ভার্চুয়ালাইজেশন থেকে। অনেকেই শুনে বিশ্বাস করবেন না হয়ত যে বাংলাদেশে ভার্চুয়ালাইজেশন অনেক আগ থেকেই চলে আসছে। এমনকি কম্পিউটার আসার আগ থেকেই। আমার এই কথা শুনে অনেকেই নড়েচড়ে বসবেন হয়ত। নড়েচড়ে বসার আগে চলুন আমাদের মত করে ভার্চুয়ালাইজেশনের একটা সংজ্ঞা দিয়ে আসি। তাতেও যদি বিষয়টা পরিষ্কার না হয়ে থাকে তার জন্য থাকবে বাংলাদেশের প্রাচীনতম ভার্চুয়ালাইজেশনের একটা উদাহরন।ভার্চুয়ালাইজেশন সহজভাবে বলতে গেলে হল একটা জিনিসকে অন্য একটা রুপে উপস্থাপন করা । যাতে করে আসল জিনিসের উপর বিভিন্ন কাজ করতে গেলে যে অসুবিধা হয়, সেই অসুবিধাগুলি উপস্থাপিত রুপে অতি সহজেই করা যায় । উদাহরন হিসাবে বলা যায় বাংলাদেশের জমি-জামা ভাগ-ভাটোয়ারা করা।

ক্লাউড কম্পিউটিং সুবিধা Archives - Rahat Hossen

ধরেন ৩০ শতক জমিকে দুই ভাগ করতে হবে । প্রতি ভাগকে আবার দু ভাগ। এটা যদি কেউ বাস্তবে করতে যায় তাকে অনেক কষ্ট করতে হবে। মাঠে যেয়ে সীমানা নির্ধারন করা অনেক কষ্টের। বাংলাদেশের মানুষ তাই কি করল ? জমির একটা ভার্চুয়ালাইজেশন করল। সেটা হল ম্যাপ। ভাগভাটোয়ার সুবিধার্তে জমিকে ম্যাপের রুপ দান করল। এখন এই জমি ভাগ করতে গেলে,ম্যাপের উপর শুধু মাত্র একটা দাগ দিলেই হবে। এটাই হল এক ধরনের ভার্চুয়ালাইজেশন। কম্পিউটারের দুনিয়ায় জমি হচ্ছে হার্ডওয়ার । আর ম্যাপ হচ্ছে ঐ হার্ডওয়ারের ভার্চুয়ালাইজেশন।এবার আসি ক্লাউডের সংজ্ঞায়। ক্লাউড মানে হচ্ছে অন্যের সম্পদ ভাড়ায় ব্যবহার করা । কম্পিউটারের দুনিয়া সম্পদকে বলা হয় রিসোর্স। আরো খোলাশা করে বলতে গেলে হার্ডডিষ্ক, মেমরী, নেটওয়ার্ক কার্ড , এমনকি সফটওয়ারকেও রিসোর্স বলে। তার মানে হল অন্যের রিসোর্স ভাড়ায় ব্যবহারকেই ক্লাউড কম্পিউটিং বলা যেতে পারে।একথা শুনে অনেকেই বলবেন, নিজের রিসোর্স বাদ দিয়ে অন্যেরটা ভাড়ায় কেন ব্যবহার করবো ? সত্যি বলতে মানুষ সবসময় অন্যেরটা ব্যবহারে করে অনেক মজা পায়। তবে সেখানে যদি ভাড়া না থাকে। কিন্তু ভাড়া দিয়েও অন্যেরটা ব্যবহারে অনেক সুবিধা পাওয়া যায়। একটা উদাহরন দেব আমি । ধরেন আপনি একটা সফটওয়ার বানিয়ে ফেলছেন। সেটা সবার কাছে নিয়ে যাওয়ার জন্য আপনার সার্ভার লাগবে। কিন্তু সে টাকা আপনার নেই । তাছাড়া আপনি নিজেও শিওর না এই সফটওয়ার কত টুকু চলবে। এমনো হতে পারে এটা ফেইসবুকের মত জনপ্রিয় হয়ে যেতে পারে । আবার এমনও হতে পারে আপনি ছাড়া এটাতে আরো কারো আকর্ষন নেই । নিজের সার্ভার ব্যবহার করলে দুই অবস্থায়ই আপনার বিপদ। ধরেন আপনি প্রায় লাখ খানেক টাকা খরচ করে একটা সার্ভার সেট আপ করে ফেললেন। যদিও বাস্তবে এর থেকে বেশি টাকা লাগবে। আর সার্ভার কিনেই কিন্তু শেষ না, এটাকে রক্ষনাবেক্ষন করা লাগবে। যাইহোক ধরেই নিলাম আপনি সব কিছুই করলেন। তারপর দেখলেন এটা কেউই খাচ্ছে না। তাহলে আপনার পুরা টাকাই লস। আর যদি ক্লাউড থেকে ভাড়ায় নিতেন তাহলে মাসে হয়ত অল্প কিছু টাকা খরচ হতে। এবার যাই অন্য কি লস হত সেই দিকে। ধরেন আপনার সফটওয়ারের জন্য পুরা দুনিয়া পাগল হয়ে যাচ্ছে। যা কিনা আপনার চিন্তার বাইরে। এত এত মানুষকে সার্ভ করার জন্য যে সার্ভার দরকার তা কেনার সামর্থ আপনার নাই। তাছাড়া সব কিছু প্রস্তুত করতে করতে যে সময় লাগবে সেই সময়টাতে যদি মানুষকে সার্ভিস দিতে পারতেন তাহলে কত লাভ হত ? ক্লাউড থাকলে মুহুর্তেই আপনি বাড়তি মানুষকে সেই সার্ভিস দিতে পারতেন। আবার যখন চাহিদা কমে যাবে মুর্হুরতেই খরচ কমিয়ে ফেলতে পারতেন।এখন আসি এই ভাড়া দেয়ার বিস্তারীত পদ্ধিতি নিয়ে। যারা এই ভাড়া দেয় তাদেরকে ক্লাউড সার্ভিস প্রোভাইডার বলে। Azure, AWS, Google, IBM এরা হচ্ছে পৃথিবীর বড় বড় কয়েকটা ক্লাঊড সার্ভিস প্রোভাইডার। এরা Pay as you go (যতটুকু ব্যবহার ততটুকু টাকা) ভিত্তিতে রিসোর্স ভাড়া দেয়। তবে ভাড়া দেয়া রিসোর্সগুলিকে কয়েকটা ভাগে ভাগ করা যায়। এর মধ্য উল্লেখযোগ্য কয়েকটি হল

১। Infrastructure as a service (IaaS)

২। Platform as a service (PaaS)

৩।Software as a service (SaaS)

৪।Function as a service (FaaS)

Infrastructure as a service (IaaS): এ পদ্ধতি আসলে কি ? অন্যভাবে বললে এই পদ্ধতি আপনি আসলে কি ভাড়া নেন ? বিষয়টা বুঝানোর জন্য জমির উদাহরনে ফিরে যাব। ধরেন আপনার অনেক জমি আছে। আপনি ভাড়া দিতে ইচ্ছুক। আপনার অনাবাদী জমি কেউ ভাড়া নেয় তবে তাকে বলা হবে Infrastructure as a service (IaaS)। এই জমি ভাড়া যে নিবে, হালচাষ, ফসল ফলানো তার দায়ত্ব। আপনি শুধু জমি ভাড়া দিয়েই খালাস।

7 Different Types of Cloud Computing Structures | UniPrint.net

Platform as a service (PaaS) : ধরেন এমন কিছু মানুষ আছে যারা জমি কর্ষিত করার ঝামেলা নিতে চায় না। কিন্তু তারাও ফসল ফলাতে ইচ্ছুক। ধরেন কেউ এসে জিজ্ঞেস করল ভাই আমি ধান চাষ করতে চাই। এমন রেডি জমি আছে ? আমি শুধু ধান গাছ লাগাবো। অন্য কোন প্যারা নিতে পারবো না। আবার কেউ এসে বলল আমি আলু চাষের জন্য জমি চাই। কেউ হয়ত পেয়াজের বাজার চাঙ্গা দেখে পেয়াজ চাষের জন্য রেডিমেড জমি চাইল। আপনি কাষ্টমারের কথা চিন্তা করে আগে থেকেই এইরকম জমি প্রস্তুত করে রাখতে পারেন এবং সেটা ভাড়া দিতে পারেন। আপনি যে এই সার্ভিস দিচ্ছেন এটার নাম হল Platform as a service (PaaS)।

Software as a service (SaaS): পৃথিবীতে অলস মানুষের সংখ্যা কম না। ধরেন আপনার এমন কিছু কাষ্টমার আছে যারা কোন প্যারাই নিতে চায় না। তারা সবকিছু প্রস্তুত চায়। তারা জমি চাষ করবে না, এমন কি ফসলও ফলাবে না , কিন্তু ফল খেতে চায় । তাদের কথা মাথায় রেখে আপনি কিছু জমিতে নিজেই সবকিছু করে রাখবেন । তাদেরকে শুধু ফলটা দিবেন। উদাহরন হিসাবে পিয়াজের কথাই বলি। ধরেন সব কিছু নিজে থেকে করে কাষ্টমারের কাছে মাসে মাসে শুধু পেয়াজ সাপ্লাই দেন। এই ধরনের সার্ভিসের নাম হল Software as a service (SaaS)। কম্পিউটার দুনিয়ায় এমন সার্ভিস আপনি প্রতিনিয়তই নিচ্ছেন। উদাহরন হল Email সেবা।

Function as a service (FaaS): আমার কাছে এটা খুব মজার। ধরেন আপনি জমিতে নিড়ানি দেয়ার একটা অভিনব পদ্ধতি আবিষ্কার করেছেন। অন্য যারা চাষ করছে তারা এটা ব্যবহার করতে চায়। বাকি সব কিছুই তাদের নিজের, শুধু নিড়ানি দেয়ার পদ্ধতিটা আপনার কাছ থেকে ভাড়া নিতে চায়। এইরকম যদি কোন প্রোগ্রামার কোণ সুনির্দিষ্ট বিষয় সমাধান করার জন্য ভাল একটা ফাংশন লিখতে পারে , চাইলে সে সেটিও ভাড়া দিতে পারে। বলতে পারে আমার ফাংশন একবার ব্যবহারে এক টাকা করে দিতে হবে। এই ধরনের সার্ভিস কে বলে Function as a service (FaaS)।

Share :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!