নেপাল-ভারত সীমান্ত সংকট ও চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব

কোভিড-১৯ মহামারীর মধ্যে হিমালয় অঞ্চলের বিতর্কিত সীমানা নিয়ে নেপাল-ভারত পরস্পর বিরোধে জড়িয়ে পড়েছে।নয়াদিল্লি  ৮ই মে ৮০ কিলোমিটার দীর্ঘ সড়ক পথের উদ্বোধনের ঘোষণা দেওয়ার পর, দু দেশের মধ্যকার কূটনৈতিক উত্তেজনা বেড়েছে। সড়কটি বিতর্কিত লিপুলেখ দিয়ে গিয়েছে, যা তিব্বত এবং চীনের সাথের কৌশলগত ত্রি-মুখী সংযোগে অবস্থিত। 

একতরফা ভাবে নির্মিত সড়কপথটি ভারতের উত্তরাখন্ড রাজ্যটিকে তিব্বতের কৈলাশ সরোবরের সাথে  লিপুলেখ পাস দিয়ে সংযুক্ত করেছে, এই পাসটিকে নেপাল ঐতিহাসিকভাবে নিজেদের দাবি করে এবং এটি ভারত ও চীনের মধ্যে সবচেয়ে সংক্ষিপ্ত ও কার্যকর বাণিজ্য পথ হিসেবে বিবেচিত।নেপাল ভারতের সড়ক উদ্বোধনের প্রতিবাদ জানিয়েছে এবং এটিকে বৃহৎ প্রতিবেশী রাষ্ট্র  কতৃক ছোট রাষ্ট্রের প্রতি হুমকি মনে করে। 

পরবর্তীতে নেপাল সরকার নেপালের একটি নতুন রাজনৈতিক মানচিত্র প্রকাশ করে যাতে তারা বিতর্কিত কালাপানি, লিম্পিয়াধুরা এবং লিপুলেখ অঞ্চলকে তাদের মানচিত্রে অন্তর্ভুক্ত করে। নয়াদিল্লি বলছে সীমানার কৃত্রিম সম্প্রসারণ ভারতের কাছে গ্রহণযোগ্য নয়।

এই প্রেক্ষাপটে, কালাপানি-লিপুলেখ সীমান্ত বিরোধ, ভারত-নেপাল সম্পর্কের উপর এর প্রভাব এবং নেপালে চীনের ক্রমবর্ধমান উপস্থিতি নিয়ে আলোচ্য নিবন্ধে আলোকপাত করা হয়েছে।        

নেপালের আভ্যন্তরীণ রাজনীতি:

বিগত ২৩ বছরে প্রথম চীনা রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে অক্টোবর,২০১৯ সালেপ্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের নেপাল সফর পরবর্তী নেপাল-চীন সম্পর্ক উর্ধ্বমুখী। চীন কৌশলগত দিক

দিয়ে নেপালকে তার ওয়ান বেল্ট এন্ড রোড ইনিশিয়েটিভের গুরুত্বপূর্ণ লিঙ্ক হিসেবে গড়ে তুলতে বিনিয়োগ এবং প্রভাব বিস্তারে ভারতের সাথে প্রতিযোগিতা করছে।২০১৮ সালের মে মাসে নেপালের কমিউনিস্ট দলগুলো একত্রে ঐক্যমত্যের সরকার গঠন করে,চীন এর স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে বিশেষভাবে আগ্রহী হয়ে উঠে।এ বছরের মে মাসে, ক্ষমতাসীন নেপাল কমিউনিস্ট পার্টির বিভিন্ন অংশের মধ্যকার ক্ষমতার লড়াইয়ে সমঝোতা করার লক্ষ্যে নেপালে নিযুক্ত চীনের রাষ্ট্রদূত ধারাবাহিকভাবে বৈঠক করে।

২০১৫ সাল থেকে নেপালের মদেশীয় জাতিগোষ্ঠীর সহায়তায় ভারত অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপ করলে, নেপাল-ভারত সম্পর্ক অবনতি হতে থাকে।মধেশীয়দের প্রতি ভারত সরকারের তৎকালীন নীতি নেপালের রাজনৈতিক অভিজাতদের ক্ষুব্ধ করেছিল।কালাপানির উপর দিয়ে লিপুলেখের দিকে সড়ক উদ্বোধনের পর নেপাল সরকার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে সম্প্রতি   ৮ মে একটি নতুন মানচিত্র প্রকাশ করে যেখানে ভারতের কুমায়ুনের উত্তরে ৩৩৫ বর্গ কিলোমিটারকে নিজেদের দাবি করে।শীঘ্রই সংবিধানের সংশোধনীর জন্য একটি প্রস্তাব নথিভুক্ত করা হয় এবং ২৬ মে সর্বদলীয় বৈঠকে সরকারের সিদ্ধান্তকে পুরোপুরি সমর্থন দেয়া হয়।সর্বশেষ ১৩ জুন নতুন মানচিত্র সহ সংবিধান সংশোধনের প্রস্তাব নেপালের পার্লামেন্টে দুই-তৃতীয়াংশের বেশি ভোট পেয়ে পাস হয়।       

কালাপানির অবস্থান:

কালাপানি ভারতের উত্তরাখন্ডের পিথুরাগড় জেলার পূর্বতম কোণে অবস্থিত একটি

অঞ্চল।এর উত্তরে চীনের স্বায়ত্তশাসিত তিব্বত এবং পূর্ব ও দক্ষিণে নেপাল।অঞ্চলটি লিম্পিয়াধুরা, লিপুলেখ এবং কালাপানির মধ্যকার কাটা কেকের সরু টুকরোর মতো।ভারতের নিয়ন্ত্রণে থাকলেও ঐতিহাসিক এবং কার্টোগ্রাফীক কারণে নেপাল অঞ্চলটিকে নিজেদের দাবি করে।উচ্চ হিমালয়ের ৩৭০০০ হেক্টর ভূমি নিয়ে অঞ্চলটি ভারত ও নেপালের মধ্যে বৃহত্তম সীমানা বিরোধ।               

কালাপানি সংকটের কারণ:

তিনটি বিষয় কে কেন্দ্র করে এই সংকট— কালী (মহাকালী নামেও পরিচিত) নদীর উৎস, লিপুলেখ পাসের অবস্থান এবং ভারত-চীন-নেপালের সন্ধিস্থল।কালাপানির উপর নেপালিরা তাদের অবস্থান দাবি করে ১৮১৬ সালের সুগাউলি চুক্তির উপর,যার অনুচ্ছেদ ৫ উল্লেখ আছে : কালী নদীর পূর্ব অংশ নেপালের অন্তর্ভুক্ত। কালাপানি অঞ্চলটি— যা প্রায় ৩৫ বর্গ কিলোমিটার— নেপালের না ভারতের তা নির্ধারিত হবে কালী নদীর উৎসস্থলের ভিত্তি করে। 

কাঠমান্ডু দাবি করছে কালী নদীর উৎস লিম্পিয়াধুরা, কালাপানি নয় যা ভারত দাবি করছে। লিম্পিয়াধুরাকে কালী নদীর উৎস ধরলে কালাপানি এবং লিপুলেখ পাস সহ প্রায় ৪০০ বর্গ কিলোমিটার অঞ্চল নেপালের অন্তর্ভুক্ত হবে।নেপালের সীমান্ত বিশেষজ্ঞরা দাবি করছেন যে ১৮২৭ ও ১৮৫৬ সালে ব্রিটিশ সার্ভেয়ার জেলারেল কতৃক প্রকাশিত মানচিত্রে কালাপানি অঞ্চলটিকে নেপালি অঞ্চল হিসাবে চিহ্নিত করা হয়েছে।নেপালের ভূমি জরিপ বিভাগের প্রাক্তন মহাপরিচালক বুদ্ধি নারায়ণ শ্রেষ্ঠার মত সিনিয়র সীমান্ত বিশেষজ্ঞরাও একিই ভাবে একমত হয়েছেন যে, কালাপানির পশ্চিমে প্রবাহিত নদীটি মূল কালী নদী যা লিম্পিয়াধুরা থেকে উদ্ভুত হয়েছে।তিনি আরো উল্লেখ করেছেন যে  , “ ওল্ড অ্যাটলাস অব চায়না”, কিং রাজত্বের সময় প্রকাশিত মানচিত্রে চীনা ভাষায় লিম্পিয়াধুরা কালী নদীর উৎস হিসেবে চিত্রিত হয়েছে।নেপাল শব্দটি নদীর উত্তর-পূর্ব অংশের জন্য মানচিত্রে লিখিত হয়েছে।     

কালাপানির দক্ষিণে একটা শাখা নদী পানখাগাদকে কালী নদীর উৎস এবং পূর্ব পাশের রিজলাইনটি সত্যিকারের সীমানা, ভারত দাবি করে। ফলে কালাপানি অঞ্চলটি ভারতের অন্তর্গত।এছাড়া ভারত করের রেকর্ড এবং অন্যান্য প্রশাসনিক নথিও প্রকাশ করে এবং কালাপানিকে তাদের উত্তরাখন্ডের পিথুরাগড় জেলার অংশ হিসেবে দাবি করে।   

লিপুলেখ পাস:

বর্তমান বিরোধের কেন্দ্র লিপুলেখ পাস যা ৫০০০ মিটার উচ্চতায় অবস্থিত।নেপালের দাবি ১৯৬২ সালে চীন-ভারত যুদ্ধের সময়, ভারত কালাপানি থেকে লিম্পিয়াধুরার দিকে ৩৭২ বর্গ কিলোমিটার দখল করেছে।সেই সময় নেপাল, বন্ধু প্রতিবেশী হিসেবে,ভারতীয় সেনাবাহিনীকে এই অঞ্চলে একটি শিবির স্থাপনের অনুমতি দেয়।পরবর্তীতে নেপালের প্রধানমন্ত্রী কীর্তি নিদি বিস্তা কয়েকবার শিবিরটি সরিয়ে নেওয়ার অনুরোধ স্বত্বেও  ভারতীয় সেনারা সেখানে থেকেই যায়।দুই দেশের মধ্যকার অসম শক্তির সম্পর্কের কারণে নেপাল ভারতকে এই অঞ্চল থেকে সেনা প্রত্যাহারে বাধ্য করতে পারেনি।                

ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি এবং নেপালের মধ্যে ৪ মার্চ,১৮১৬ সালে সুগাউলি চুক্তি মধ্য দিয়ে নেপাল-ভারত সীমানা চিহ্নিতকরণ শুরু হয়।কালী নদীকে দুই দেশের সীমান্ত ঘোষণা করে আশা করা হয়েছিল সীমান্ত বিরোধের অবসান হবে।গত ছয় দশক ধরে সীমানা এবং নো ম্যান্স ল্যান্ডের বিরোধ এখনো পর্যন্ত চলছে। 

কালাপানি ও লিপুলেখের কৌশলগত গুরুত্ব:

লিপুলেখ ও কালাপানি ভারত-নেপাল এবং চীনের মধ্যকার ত্রি সংযোগ। ভূকৌশলগত ও ভূরাজনৈতিক গুরুত্বের কারণে ভারত সবসময় চীনের আক্রমণ কিংবা পিপলস লিবারেশন আর্মির (পিএলএ) গতিবিধি নজর রাখে।

চীনের দিক থেকে ও কালাপানি ভূ-রাজনীতি মুক্ত হয় নি।২০১৮ সালে, ডোকলাম অচলাবস্থা চলাকালীন চীনা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সীমানা ও মহাসাগর বিষয়ক উপ-মহাপরিচালক, ওয়েং ওয়েনলি মন্তব্য করেছিলেন “ ভারতের দিক থেকে ও অনেকগুলি ত্রি সংযোগ রয়েছে।  যদি আমরা একই অজুহাতটি ব্যবহার করি এবং চিন, ভারত ও নেপালের মধ্যবর্তী কালাপানি অঞ্চলে এমনকি ভারত-পাকিস্তানের মধ্যবর্তী কাশ্মীর অঞ্চলে প্রবেশ করি তখন কী হবে? ” তদুপরি, ভূ-অর্থনৈতিক কারণও এর সাথে জড়িত। এটি উত্তর ভারত থেকে কৈলাশ মানস সরোবরে যাওয়ার সংক্ষিপ্ত এবং সরাসরি রুট। বর্তমানে ভারতীয় তীর্থযাত্রীদের কৈলাস মানস সরোবরে যেতে হয় নেপালগুঞ্জ- হুমলা কিংবা কাঠমান্ডু-কেরুং হয়ে।   

নেপথ্যে কী চীন?

ভারত ও নেপালের মধ্যে সীমান্ত বিবাদ বহু বছর ধরে চলছে,তাই সংকট সৃষ্টির জন্য চীনকে দোষারোপ করা অযৌক্তিক। ভারতের সড়ক নির্মানের  ঘোষণায়, প্রধানমন্ত্রী অলি এবং নেপালি জাতীয়তাবাদীরা সবসময় নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে।ভারত বহু বছর ধরে ভালোভাবেই অবগত ছিল যে ইস্যুটি নেপালের  তীব্র রাজনৈতিকীকরণ হবে।

ভারতের সেনাপ্রধান চীনকে ইঙ্গিত করে বলেন নেপাল তৃতীয় পক্ষের নির্দেশে  বিষয়টি উত্থাপন করেছে।তার কথার প্রভাব নেপালের আভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে কি ধরনের প্রভাব পড়বে তা পরিমাপ করতে ভারত ব্যর্থ হয়েছে। মূলত নব্বইয়ের দশকের শেষের দিক থেকে নেপালের উপর্যুপরি কূটনৈতিক প্রক্রিয়ায় সমস্যার সমাধানের দাবি ভারত কতৃক বরাবরই উপেক্ষিত হয়েছে।এটা ভারতের বৈদেশিক মন্ত্রণালয়ের বিবৃতি বিরোধীও ছিল যেখানে স্বীকৃতি দিয়েছে যে এই অঞ্চলটিতে বিরোধ র‍য়েছে এবং উভয়পক্ষ সম্মতির ভিত্তিতে বিষয়টিকে কূটনৈতিক সংলাপের মাধ্যমে সমাধান করবে। 

এর মানে এই নয় যে, লাদাখে চীন-ভারতের মুখোমুখি সামরিক অবস্থানের প্রেক্ষাপটে বেইজিং নেপালকে আরো বেশি দৃঢ় অবস্থান নিতে সমর্থন কিংবা প্ররোচিত করবে না।এটা নেপাল-ভারত সংকটকে আরো বেশি বিপদজনক করবে।               

নেপাল-চীন সম্পর্ক: ভারতের প্রায়োগিক দৃষ্টিভঙ্গি

দিল্লির প্রচলিত ধারণার বিপরীতে, চীন দীর্ঘদিন ধরে কাঠমান্ডুর আন্তর্জাতিক সম্পর্কের অংশ।উনবিংশ শতাব্দীর শুরুতে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ভিত্তি অর্জন করেলে, নেপালের শাসকেরা, বেইজিংকে হিমালয় অঞ্চলে কলকাতার সম্প্রসারণ ঠেকাতে চীনের ফ্রন্টলাইন হিসেবে কাজ করার জন্য ধারাবাহিক প্রস্তাব দিয়েছিল।কোম্পানির বিরুদ্ধে লড়াইয়ের জন্য কাঠমান্ডু ভারতীয় রাজকুমারদের নিয়ে জোট গঠন করার চেষ্টাও করেছিল। ১৮১৬ সালে প্রথম অ্যাংলো-নেপাল যুদ্ধে হেরে যাওয়ার পরেও কাঠমান্ডু, বেইজিং-কলকাতার মধ্যে কৌশলি সম্পর্ক বজায় রাখে। প্রথম আফিম যুদ্ধের (১৮৩৯-৪২) পরে এই সম্পর্কের ঝোক কোম্পানির অনূকূলে গেলে নেপালের শাসকেরা কলকাতায় উষ্ণ অভ্যর্থনা পেয়েছিল। ১৮৫৭ সালের বিদ্রোহ যখন কোম্পানির ভিতকে ঝাকুনি দিল, কাঠমান্ডু একে সমর্থন দিল এবং ব্রিটিশ রাজ কোম্পানির স্থলাভিষিক্ত হলে নেপাল তার হারানো কিছু অঞ্চল ফিরে পেয়েছিল। ব্রিটিশ রাজের শক্তি বৃদ্ধির সাথে সাথে কাঠমান্ডুর শাসকেরা কলকাতার আশ্রিত রাজ্য হিসেবে সুবিধা ভোগ করেছিল। ভারত এই কাঠামোকে উত্তরাধিকার সূত্রে ফেলেও এটিকে টিকিয়ে রাখা তার পক্ষে সম্ভব হয় নি।         

১৯৫০ সালের শান্তি ও বন্ধুত্বপূর্ণ চুক্তি, বিট্রিশ রাজ এবং এর উত্তরসূরী ভারতের সাথে নেপালের আশ্রিতের সম্পর্কের ধারণা দেয়।নেপালে গণ রাজনীতির উত্থান, বর্ধমান নেপালি জাতিয়তাবাদ এবং কাঠমান্ডুর বর্ধমান আন্তর্জাতিক ব্যক্তিত্বের নিকট এই সম্পর্ক ক্রমশ চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হয়।

তিব্বতে চীনা কমিউনিস্ট পার্টি তার ক্ষমতা কুক্ষিগত করার পর নেপালকে নিরাপত্তার আশ্বাস দেয়,যা কাঠমান্ডুর ভারসাম্য বজায় রাখার পুরনো কৌশলি সম্পর্কের খেলাকে পুনরুজ্জীবিত করে।১৯৫০ এর দশক থেকে নেপালের পররাষ্ট্রনীতি মূলত ভারতের সাথে “ বিশেষ সম্পর্ক”কে দূর্বল করা এবং চীনের সাথে অধিকতর সহযোগিতামূলক সম্পর্ক গড়ে তোলার দিকে নজর দেয়। নেপাল বৃহৎ দুই প্রতিবেশী চীন-ভারতের সাথে  সম্পর্ক বজায় রাখার ক্ষেত্রে বিভিন্ন লেভেলের — নন অ্যালাইমেন্ট, বৈচিত্র্যকরণ, “ শান্তির অঞ্চল”, সমদূরত্ব— কৌশল প্রয়োগ করে যা  বৈদেশিক  সম্পর্কের আকাঙ্ক্ষা পূরণে কৌশলগত সুযোগ সৃষ্টি করে।চীন যত শক্তিশালী হয়ে উঠবে, ভারতের সাথে কাঠমান্ডুর বিকল্পগুলি আরো বিস্তৃত হবে।

নেপালে চীনের রাজনৈতিক প্রভাব বাড়ার সাথে সাথে বেইজিং পরোক্ষভাবে বর্তমান সংকট চলাকালীন নেপালকে ভারতের বিরুদ্ধে সাহসী অবস্থান নিতে প্রধানমন্ত্রী কে পি  অলিকে উৎসাহিত করতে পারে।সাম্প্রতিক উদাহরণ গুলো থেকে দেখা যায় চীন নেপালের ক্ষমতাসীন সরকারকে ঠিকিয়ে রাখতে বিভিন্ন পক্ষের মধ্যে মধ্যস্থতা করেছে।

ভারতের ভয় এখানে,হিমালয় জুড়ে চীনের উপস্থিতি বৃদ্ধি, বিশেষত বিআরআই পরে, ভারতকে নেপাল কেন্দ্রীক নীতি পরিবর্তনে বাধ্য করেছে।দিল্লি দীর্ঘদিনের ভূকৌশলগত অস্বীকৃতি ও বিচ্ছিন্নতার নীতি পরিবর্তন করে অধিকতর অর্থনৈতিক সাহায্য ও কানেক্টিভিটির দিকে গুরুত্বারোপ করছে। যদি ও ভারতের এখনো অনেক নীতিনির্ধারক উনিশ শতকের ঔপনিবেশিক প্রিজম দিয়ে একবিংশ শতাব্দীর নেপালের দিকে তাকাচ্ছেন: সীমিত স্বার্বভৌমত্বের বাফার রাষ্ট্র, যেখানে ভারতের উচিত চীনপন্থী সরকারকে পতনের জন্য  পলিটিকাল ইঞ্জিনিয়ারিং ও সম্পদকে ব্যবহার করা।                 

শেষ কথা:

নেপাল -ভারত উভয়পক্ষকে রাজনৈতিক বিশ্বাস পুনরুদ্ধার ও কূটনৈতিক সংলাপ শুরু করতে হবে, সেটা মাস কিংবা বছর লাগুক,কার্যকর সমঝোতার বিকল্প নেই। সীমান্ত বিরোধ এখন উভয় দেশের মধ্যে একটি স্থায়ী রাজনৈতিক বিবাদে পরিণত হয়েছে। বিদ্যমান স্টাটাস কো ভারতের আঞ্চলিক নিয়ন্ত্রণে সহায়ক যা চলমান সংকট ধামাচাপা দেয়ার জন্য দিল্লি কৌশলগত সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করতে পারে, তবে নেপালে তার স্বার্থ এবং প্রভাবের উল্লেখযোগ্য ক্ষতি ছাড়া নয়।     

যত তাড়াতাড়ি ভারত নেপালের সাথে এই বিরোধ নিষ্পত্তি করবে, চীনের জড়িত হওয়ার সম্ভাবনা তত কমবে।বেইজিং এবার শান্ত থাকলেও ভবিষ্যৎ হিসাব-নিকাশ পাল্টে যেতে পারে। ভারত নেপালের মধ্যকার কালাপানি সংকটটি ২০১৭ সালে চীন ভুটানের মধ্যকার ডোকলাম সংকটের নিখুঁত প্রতিফলন যেখানে ভারত পদক্ষেপ নিয়েছিল এবং স্থিতিবস্থা ফিরিয়ে আনতে সামরিক বাহিনী মোতায়েন করেছিল।

দিল্লিকে অবশ্যই নেপালের সাথে সম্পর্ক উন্নয়নের দিকে মনোনিবেশ করতে হবে।নেপালের অর্থনৈতিক ভূগোলের বাস্তবতা, জাতীয় স্বার্থ এবং কাঠমান্ডুর সহজাত ভারসাম্যের রাজনীতি, ভারতকে নেপালের সাথে ভবিষ্যৎ সম্পর্ক নির্ধারণে শক্তিশালী কাঠামো সরবরাহ করবে। যা দিল্লির পক্ষে টেকসই ও স্বার্থ ভিত্তিক অংশীদারিত্বের সম্পর্ক গড়ে তোলা এবং উভয় পক্ষের শক্তিশালী জনসমর্থন নিশ্চিত করবে।                      

গবেষনাঃ মোর্শেদ আলম,আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক     

Share :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!