পানি সমস্যার আন্তর্জাতিক স্বরুপ (দেশে দেশে বাধ নির্মাণ

পানি মানুষের জীবনের জন্য অপরিহার্য। জনসংখ্যা বৃদ্ধি এবং শিল্প সমৃদ্ধির কারণে স্বাদুপানির জন্য বিশ্বব্যাপী চাহিদা দ্রুত বাড়ছে। একই সময়ে, জলবায়ু পরিবর্তন এবং পরিবেশগত অবক্ষয় এর জন্য পানির গুণগত মান পরিবর্তন করছে। অ্যানা স্যুলজ-এর মতে, পানি প্রকৃতির সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ, যা মানুষের জীবন ও জীবিকার জন্য অপরিহার্য। কিন্তু এই পানি নিয়ে সমস্যার সৃষ্টি হয় যখন এই সম্পদ বণ্টনব্যবস্থা কার্যকর, টেকসই ও সবার জন্য সুবিধাজনক না হয়। গত কয়েক দশকে ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার সঙ্গে সঙ্গে রাষ্ট্রগুলো প্রযুক্তিগত দক্ষতা অর্জন করেছে। এই প্রযুক্তিগত দক্ষতা প্রমত্তা নদীর ওপর বিভিন্ন অবকাঠামো নির্মাণে সহায়তা করেছে। এর ফলে রাষ্ট্র বিপুল পরিমাণে অর্থ ও প্রযুক্তি ব্যবহার করছে আন্তনদীর পানিসম্পদ আহরণের জন্য। এতে রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে তৈরী হয়েছে দ্বন্দ্ব ,অবিশ্বাস । নিম্নে বিশ্বের গুরুত্বপুর্ণ নদীগুলো নিয়ে রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে বিরোধের স্বরুপ নিয়ে আলোচনা করা হল।

১। নীল নদীর অববাহিকায় জলের বিষয়ে বিরোধঃ
নীল নদের অববাহিকা তার এগারোটি দেশগুলির মধ্যে নীল নদের জলের সম্পদে আহরণ এবং অধিকার নিয়ে দ্বন্দ দিনে দিনে বড় সংকটে রুপ নিচ্ছে । বড় দাতা সংস্থাগুলির সমর্থন নিয়ে সহযোগিতা জোরদার করার প্রয়াসে ১৯৯৯ সালে ১০ টি দেশের মধ্যে ৯ টি দ্বারা প্রতিষ্ঠিত নীল বেসিন ইনিশিয়েটিভ (এনবিআই) কিছু সাফল্য অর্জন করেছে। তবুও, ২০০৭ সাল থেকে, উজান এবং নিম্ন প্রবাহের দেশগুলির মধ্যে পানির স্বার্থ নিয়ে বিরোধ লেগেই আছে । দেশগুলির মধ্যে ত্রিপক্ষীয় আলোচনার ফলে একটি কাঠামো চুক্তি হয়েছিল, যা সময়ে সময়ে একটি সীমানা চুক্তির জন্য ক্ষেত্র প্রস্তুত করতে পারে। এ পর্যন্ত নীলের উপর ১০ টি বাঁধ নির্মাণ হয়েছে। যার মধ্যে মিশর ৫ টি, সুদান ৪ টি, উগান্ডা ১টি বাধ নির্মাণ করেছে। এক্ষেত্রে বাঁধ নির্মাণ করে সুবিধা নিচ্ছে মিশর ও সুদান। অথচ তারা নদী প্রবাহের আপার স্ট্রিম দেশ। এক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় আলোচিত বাঁধ হলো হল আসওয়ান(Aswan) বাঁধ। যেটি মিশর নির্মাণ করেছে। এ বাঁধকে কেন্দ্র করে যে প্রকল্প করা হয়েছে তা হলো the New Valleys Project. এটি ৪৫০ কিলোমিটার দীর্ঘ,১০ মিটার প্রশস্থ এবং ১৬০ বিলিয়ন কিউবেক মিটার পানি ধরে রাখতে পারে। এ বাঁধকে কেন্দ্র কর্রে যে লেক নাসের তৈরী করা হয়েছে , তা মূলত সেচ কাজের জন্য এবং বিদ্যুৎ উৎপাদন করার জন্য। সামরিক, অর্থনৈতিক, ও আন্তঃ দ্বন্দ্ব নিরসনে এ বাঁধগুলো মিশরকে ব্যাপক সহায়তা করছে, কিন্তু এর পাশাপাশি তারা ইথিওপিয়া কে তার হাইড্রো-পাওয়ার ও সেচ ব্যবস্থা উন্নত করতে দিচ্ছে না। অন্যদিকে আসওয়ানের ঘবি New Valleys Project এর মাধ্যমে পানি সরবরাহ বৃদ্ধি করে খাদ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে চাইছে, যা সুদান তার প্রকল্প দিয়ে সঠিকভাবে করতে পারছেনা এবং ইথিওপিয়া তো মিশরের বিরোধীতার কারণে বাঁধই নির্মাণ করতে পারেনি।

২। তুরস্ক, সিরিয়া এবং ইরাক: ফোরাত-টাইগ্রিসকে কেন্দ্র করে বিরোধঃ
ইউফ্রেটিস-টাইগ্রিস অববাহিকাটি তুরস্ক, সিরিয়া এবং ইরাকের মধ্যে এবং ইরান টাইগ্রিস অববাহিকার অংশ নিয়ে গঠিত। ১৯৬০ -এর দশক থেকে একতরফাভাবে সেচ প্রকল্পগুলি নদীর প্রবাহকে পরিবর্তিত করে, দেশগুলির মধ্যে রাজনৈতিক উত্তেজনা ও অববাহিকার মধ্যে উত্তেজনার চাপ সৃষ্টি করেছে। বিরোধগুলি তিনটি সরকারকে বেসিনের নদীগুলিকে কার্যকরভাবে পরিচালনা করতে বাধা দিয়েছে। ১৯৮০ সালে তুরষ্ক আতাতুর্ক বাঁধ দিলে এ বিরোধ বেড়ে যায়। তবে তুরষ্ক পানি প্রত্যাহার করার জন্য ইরাক ও সিরিয়াকে অবগত করানোর জন্য ১৯৮৯ সালে তথা এক বছর অগেই প্রতিনিধি দল প্রেরন করে। জানুয়রি মাসে কৃষি ও সেচ কাজে নদীর পানির প্রয়োজন না থাকায় তুর্কী সরকার এই সময়ে আতাতুর্ক বাদে পানি রিজার্ভ করার কথা ঘোষনা করে। কিন্তু সিরিয়া ও ইরাক সরকারীভাবে এ প্রস্তাব প্রত্যাখান করে। কিন্তু তুর্কী সরকারের ঘোষনা অনুযায়ী জানুয়ারীতে পানি প্রত্যাহার করলে নিম্ন এলাকা তথা ইরাকে উভয় নদীর পানিই প্রায় শুকিয়ে যায়। তখন ইরাকও সিরিয়া সরকার অবস্থার জন্য তুরষ্ককে দায়ী করে ফলে পানি নিয়ে বিরোধ বৃদ্ধি পায়।
যদিও 2000 এর দশকে সহযোগিতার প্রচেষ্টা শুরু করা হয়েছিল, তবুও এই বেসিনের জলের ব্যবস্থাপনায় একটি আনুষ্ঠানিক চুক্তির ফল এখনও পর্যন্ত পাওয়া যায়নি।

৩। আফগানিস্তান ও ইরানের মধ্যে আন্তঃনদী বিরোধঃ
যুদ্ধবিরোধী পুনর্গঠন ও উন্নয়নের পক্ষে হেলমান্দ নদীর জলের ও হরিরুদকে উন্নয়নের আফগানিস্তানের প্রচেষ্টা ইরানকে উদ্বেগে ফেলে দিয়েছে । ইরান সরকার আফগানিস্তানের কৃষি সম্প্রসারণ এবং বাঁধ নির্মাণ কার্যক্রমকে তার পূর্ব ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় জলের সুরক্ষার জন্য হুমকিস্বরূপ মনে করে। একাধিক পানিচুক্তি কার্যকর হওয়ার পরেও কোন একটি অগ্রগতি অর্জন করতে পারেনি।

৪।মেকং নদীর অববাহিকায় বাঁধ প্রকল্প এবং বিরোধঃ
মেকং অববাহিকা জলবিদ্যুৎ উত্পাদন, বিশেষত চীন এবং লাওস অঞ্চলে বাঁধ নির্মাণের বিশাল কর্মযজ্ঞ চলছে । এটি কূটনৈতিক উত্তেজনা বাড়িয়েছে কারণ বাঁধগুলির ফলে উজান দেশগুলিতে ভয়াবহ বন্যা থেকে শুরু করে পানির অভাব পর্যন্ত নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে । এই উত্তেজনা নিরসনে মেকং রিভার কমিশনের (এমআরসি) কার্যকারিতা খুব বেশী আগায়নি কারণ এর কার্যকর প্রয়োগের ক্ষমতা না থাকায় এবং পুরো সদস্য হিসাবে যোগ দিতে চীনের অনীহা কারণে । এমআরসি-তে যোগদানের পরিবর্তে চীন বিকল্প প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়ার প্রস্তাব দিয়েছে । তারা উজানে মেকং অববাহিকায় বাঁধ নির্মাণের জন্য সহায়তার প্রস্তাব দিয়েছে । তবে, আরও আনুষ্ঠানিক সহযোগিতা ছাড়াই, বিশেষত উজানে চীনের বাঁধ নির্মাণ কার্যক্রম মেকং নদীর অববাহিকায় অস্থিতিশীল তা বৃদ্ধি করতে পারে । চীনে এসব বাঁধ নির্মাণ প্রকল্প দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার Mekong, Nu যাকে মিয়ানমারে Salween বলে ও Yarlung Tsangpo, যাকে ভারতে ও বাংলাদেশে ব্রহ্মপুত্র নামে ডাকা হয়, এই নদীগুলোর পানি সরবরাহে বিঘ্ন ঘটাবে।

৫। ভারত-পাকিস্তান পানি সমস্যাঃ১৯৬০ সাল থেকে ভারত-পাকিস্তান সিন্ধু পানি চুক্তি মেনে আসছে৷ এই সিন্ধু নদ কাশ্মীর হয়ে ভারত থেকে পাকিস্তানে প্রবেশ করেছে৷ এই চুক্তি অনুযায়ী, ভারত হয়ে হিমালয় থেকে পাকিস্তানে প্রবেশকারী ইরাবতী, শতদ্রু ও বিপাশা নদীতে কোনও স্থাপনার কাজ করতে পারবে না ভারত৷ একইসঙ্গে কাশ্মীর হয়ে পাকিস্তানের পূর্বাঞ্চলে প্রবাহিত হওয়া সিন্ধু, ঝিলম ও চন্দ্রভাগায় পাকিস্তানের পানি ব্যবহারের অধিকার বেশি৷ এই ছয় মূল নদ-নদী দুইদেশে প্রবাহমান৷ তবে কাশ্মীর সীমান্তের ভারতীয় ‘কৃষানগঙ্গা জলবিদ্যুৎ প্রকল্প নতুন করে সংকট তৈরী করছে । এ প্রকল্প নির্মিত হয়েছে ঝিলাম নদীর শাখা নিলমের প্রবাহে। এটা পাকিস্তানে পানিসংকটের একটি কারণ হয়েছে

৬।ভারত-চীন পানি সমস্যাঃ
ভারতের নদীর পানির হিস্যার ২৯ শতাংশ ব্রহ্মপুত্রের। দেশটির বর্তমান ও ভবিষ্যৎ জলবিদ্যুতের প্রধান এক উৎস বিবেচনা করা হয় একে। ফলে এই প্রবাহে চীনের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ দিল্লির জন্য মহা উদ্বেগের ব্যাপার। গত ২৯ অক্টোবর ‘সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট’ রিপোর্ট করেছে, চীন তিব্বত থেকে জিনজিয়াং পর্যন্ত পানি সরাতে এক হাজার কিলোমিটার দীর্ঘ (অবশ্যই বিশ্বে সবচেয়ে বড়!) টানেল তৈরি করবে। এর মধ্য দিয়ে চীন মরুময় জিনজিয়াংয়ের একাংশকে সবুজ করতে আগ্রহী। আবার ভুটান-ভারত সীমান্তের খুব কাছেই চীন তিব্বতে ব্রহ্মপুত্রের প্রবাহে জাংমু ড্যাম তৈরি করেছে প্রায় এক দশক আগে, কিন্তু তা স্বীকার করেছে কেবল ২০১০ সালে। উপরন্তু, ২০১৩ সালে তৈরি নতুন পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনায় তারা এরূপ আরও তিনটি ড্যাম তৈরির কথাও জানায়।ভারতও বসে নেই। ব্রহ্মপুত্রের ভাটিতে তাদের প্রকল্পগুলোও বিশাল। আসাম ও অরুণাচলে যথাক্রমে শুভনশ্রী ও দিবাং প্রকল্পের মাধ্যমে যথাক্রমে ২ হাজার ও ২ হাজার ৮৮০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য তাদের। পূর্ণ উদ্যমে এগিয়ে চলছে উভয় প্রকল্পের কাজ। যমুনার পানিতে চীন-ভারতের এরূপ প্রতিযোগিতামূলক ড্যাম ও জলবিদ্যুৎকেন্দ্র তৈরিতে বাংলাদেশ দর্শকমাত্র।

এছাড়াও
জর্ডান নদীর পানিবণ্টনকে কেন্দ্র করে ইসরায়েল, জর্ডান, লেবানন, সিরিয়া এবং পশ্চিম তীরের মধ্যে দ্বন্দ্ব চলে আসছে।
১৯৫০-এর দশক থেকে দুই কোরিয়ার মধ্যে যুদ্ধাবস্থা চলে আসছে। ১৯৮০-এর প্রথমভাগে দক্ষিণ কোরিয়া কর্তৃক হান নদীর ওপর বাঁধ নির্মাণ দুই কোরিয়ার মাঝে প্রায় যুদ্ধাবস্থা তৈরি করে।
বাংলাদেশ ভারত পানি সমস্যা একটি দীর্ঘদিনের আলোচনার বিষয়। ১৯৭১ সালের পর থেকেই মূলত এই পানি সমস্যা ব্যাপারটি উঠে আসে । এই সমস্যা শুরু হয় ১৯৭৫ সালে ফারাক্কা বাঁধ নির্মাণের মধ্য দিয়ে । এরপর একে একে ভারত বাংলাদেশের উজানে একাধিক বাঁধ নির্মাণ করতে থাকে । যেমন টিপাইমুখ বাধ , গজলডোবা বাধ , আন্তনদী সংযোগ প্রকল্প ইত্যাদি। এসব প্রকল্প নিয়ে এবং বাংলাদেশ-ভারত পানির সমস্যা নিয়ে বিস্তারিত পরে কোন এক পর্বে আলোচনা করা হবে।

//কোন সাজেশান থাকলে কমেন্টে জানাবেন ।
সুত্রঃ ১। বিভিন্ন আন্তুর্জাতিক ও দেশীয় গনমাধ্যম থেকে
সংগৃহীত , অনুদিত,সম্পাদিত একটি লিখা। //

মুহাম্মদ ইরফান উদ্দীন
উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা
৩৭ তম বিসিএস নন-ক্যাডার

Share :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!