বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষন ও লিগ্যাল ফ্রেমওয়ার্ক অর্ডার ১৯৭০ এর যোগসুত্র

বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণের একটি বড় বৈশিষ্ট্য হলো এর সার্বজনীনতা এবং মানবিকতা৷ যে-কোনো নিপীড়িত জনগোষ্ঠীর জন্য এই ভাষণ সব সময়ই আবেদন সৃষ্টিকারী৷ এই ভাষণে গণতন্ত্র, আত্মনিয়ন্ত্রণ, স্বাধিকার, মানবতা এবং সব মানুষের কথা বলা হয়েছে৷ ফলে এই ভাষণ দেশ-কালের গণ্ডি ছাড়িয়ে সার্বজনীন হয়েছে৷ আর একজন মানুষ একটি অলিখিত বক্তৃতা দিয়েছেন, যেখানে স্বল্প সময়ে কোনো পুনরুক্তি ছাড়াই একটি জাতির স্বপ্ন , সংগ্রাম আর ভবিষ্যতের দিক নির্দেশনা দিয়েছেন ৷ তিনি বিশ্বাসের জায়গা থেকে কথা বলেছেন৷ সাধারণ মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য ভাষায় কথা বলেছেন৷ সবচেয়ে বড় কথা, বঙ্গবন্ধু সাধারণ মানুষের চাওয়া-পাওয়া বুঝতে পেরেছেন৷ তাঁরা যা চেয়েছেন, বঙ্গবন্ধু তা-ই তাঁদের কাছে তুলে ধরেছেন৷ ফলে এই ভাষণটি একটি জাতির প্রত্যাশার আয়নায় পরিণত হয়৷ এই ভাষণই একটি জাতিকে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়তে উদ্বুদ্ধ করেছে৷ মুক্তিযুদ্ধ চলাকালেও এই ভাষণ প্রেরণা জুগিয়েছে৷ আর এতবছর পরও মানুষ তাঁর ভাষণ তন্ময় হয়ে শোনেন ৷

ভাষণের প্রেক্ষাপটঃ
বঙ্গবন্ধু চেয়েছিলেন আলোচনার মাধ্যমে সংঘাত এড়িয়ে একটা ফয়সালা। কিন্তু পশ্চিম পাকিস্তানের জনগণ ও সামরিক বাহিনীর কাছে মুখ রক্ষার জন্য সংঘাতের পথে যাওয়া ছাড়া ইয়াহিয়া ও ভুট্টোর কাছে কোনো বিকল্প ছিল না। শেখ মুজিবের দাবির মুখে ইয়াহিয়া ১৩ ফেব্রুয়ারি ঘোষণা দেন, ঢাকায় জাতীয় পরিষদের অধিবেশন বসবে ৩ মার্চ। বাঙালির অপেক্ষার প্রহর যেন শেষ হতে চলল।পয়লা মার্চ বেলা একটায় রেডিওতে জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিতের ঘোষণা দেওয়া হলো। রেকর্ডকৃত ঘোষণাটি প্রেসিডেন্টের নামে পাঠ করা হলেও প্রেসিডেন্ট এতে কণ্ঠ দেননি। ঘোষণায় বলা হলো, ‘বিগত কয়েক সপ্তাহে আমাদের রাজনৈতিক নেতাদের মধ্যে কয়েকটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। কিন্তু আমাকে দুঃখের সঙ্গে বলতে হচ্ছে যে ঐকমত্যে পৌঁছানোর পরিবর্তে আমাদের কোনো কোনো নেতা অনমনীয় মনোভাব দেখিয়েছেন। এটি দুর্ভাগ্যজনক। পূর্ব পাকিস্তান ও পশ্চিম পাকিস্তানের নেতাদের মধ্যে রাজনৈতিক মোকাবিলা একটি দুঃখজনক পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে।…সংবিধান তৈরির ব্যাপারে যুক্তিসংগত সমঝোতায় পৌঁছার জন্য রাজনৈতিক নেতাদের আরও কিছু সময় দেওয়া উচিত। এ সময় দেওয়ার পর আমি একান্তভাবে আশা করি যে তাঁরা একে কাজে লাগাবেন এবং সমস্যার একটা সমাধান বের করবেন।

অধিবেশন স্থগিত নিয়ে আর্চার ব্লাড এর বক্তব্যঃ

১৯৭০ সালের ১২ নভেম্বরে বাংলাদেশের উপকূলে স্মরণকালের সবচেয়ে ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড় হয়েছিল। তখন অবহেলার কারণে একধরনের বিচ্ছিন্নতাবোধ তৈরি হয়েছিল। ঢাকায় মার্কিন কনস্যুলেটের প্রধান আর্চার ব্লাড ওয়াশিংটনে পররাষ্ট্র দপ্তরে পাঠানো এক বার্তায় বলেছিলেন, ‘ঘূর্ণিঝড়ের আগে পাকিস্তানের ঐক্য বজায় থাকার সম্ভাবনা ছিল ৫০:৫০।নির্বাচনেরপর এ সম্ভাবনা ঐক্যের বিরুদ্ধে ৭৫: ২৫ অনুপাতে হেলে পড়ে। জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিতের ঘোষণা দেওয়ার পর ঐক্যের সম্ভাবনা এখন ০: ১০০।’[তথ্যসূত্র: মহিউদ্দিন আহমদ, আওয়ামী লীগ: যুদ্ধদিনের কথা ১৯৭১]

লিগাল ফ্রেমওয়ার্ক অর্ডার ১৯৭০ঃ
১৯৭০ সালের ৩১ মার্চ প্রেসিডেন্ট জেনারেল ইয়াহিয়া খান লিগাল ফ্রেমওয়ার্ক অর্ডার ঘোষণা করেন। এতে বলা হয় যে আইনসভায় ৩০০টি আসন থাকবে। ১৯৫৬ সালের সংবিধানে সংখ্যাসাম্যের উল্লেখ ছিল। ফ্রেমওয়ার্কে রাষ্ট্রের দুই অংশের জন্য সংখ্যানুপাতের কথা বলা হয়। এই নিয়মের আওতায় পূর্ব পাকিস্তান ১৬২টি ও পশ্চিম পাকিস্তান ১৩৮টি আসন লাভ করে। আরো উল্লেখ করা হয় যে জাতীয় পরিষদ অধিবেশন আহ্বানের ১২০ দিনের মধ্যে একটি নতুন সংবিধান প্রণয়ন করবে, কিন্তু প্রক্রিয়ার নিয়ম ভবিষ্যত আইনসভার হাতে অর্পণ করা হয়।১২০ দিনের মধ্যে নতুন আইনসভা সংবিধান প্রণয়নে ব্যর্থ হলে নতুন নির্বাচন দেয়া হবে। রাজনৈতিক দল কর্তৃক প্রস্তাবিত সকল বক্তব্য ও সম্মতি প্রস্তাব রাষ্ট্রপতির সামনে সত্যায়িত করার জন্য পেশ করা হবে।

জাতীয় পরিষদ অধিবেশন স্থগিত হয়ে পড়ায় কেন এত অস্থিরতাঃ

এই ফ্রেমওয়ার্ক অনুযায়ী গণপরিষদ ১২০ দিনের মধ্যে সংবিধান রচনা করতে না পারলে ৭০ এর নির্বাচন বাতিল হয়ে যাওয়ার আশংখা ছিল । আর এদিকে গণপরিষদ বৈঠকে বসা নিয়ে নিয়ে বঙ্গবন্ধু-ভুট্টোর আলোচনার সফলতা নিয়েও ব্যাপক সন্দেহ তৈরী হচ্ছিল । আর তাতে পুর্ব বাংলার পরিস্থিতি ক্রমশ খারাপের দিকে যাচ্ছিল । মুলত প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া চেয়েছিলেন ভুট্টোকে দিয়ে সমঝোতার পথ বন্ধ করে দিয়ে নতুন সংবিধান রচনা ব্যর্থ করে দিয়ে
লিগ্যাল ফ্রেমওয়ার্কের শর্তানুযায়ী গনপরিষদ বাতিল করে দিয়ে তার ক্ষমতা অক্ষুন্ন রাখতে কারন বঙ্গবন্ধু চেয়েছিলেন ৬ দফার ভিত্তিতে নতুন সংবিধান রচনা করতে । প্রেসিডেন্ট এর এ প্ল্যান অনুযায়ী ১৫ ফেব্রুয়ারী পিপলস পার্টির নেতা জুলফিকার আলী ভুট্টো গনপরিষদ অধিবেশন বয়কট করেন এবং যেই সদস্যরা অধিবেশনে যোগ দিবেন তাদের পা ভেঙে দেওয়ার হুমকি দেন। এই অযুহাতে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া ১ মার্চ সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানের সাথে আলোচনা না করেই গনপরিষদ অধিবেশন স্থগিত ঘোষনা করেন । এতে পুর্ব বাংলায় অস্থিরতা ছড়িয়ে পড়ে । ২ মার্চ থেকে অসহযোগ আন্দোলন চলতে থাকে ।

১৯৭১ সালের ৭ই মার্চ বিশাল জনসমুদ্রে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মুক্তিকামী বাঙালি

বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণ বিশ্ব ...

জাতিকে মুক্তির বাণী শোনান৷ এই দিনে ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সোহরাওয়ার্দি উদ্যান) মহান নেতা বজ্রকণ্ঠে ঘোষণা করেন, ‘‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম৷” তিনি বলেন, ‘‘রক্ত যখন দিয়েছি, রক্ত আরও দেবো, এ দেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়বো, ইনশাআলাহ!”
আমরা এগিয়ে যায় স্বাধীনতার দিকে। অর্জন করি লাল সবুজের দেশ বাংলাদেশ ।

সুত্রঃ বিভিন্ন ব্লগ , দেশীয় ,আন্তর্জাতিক গনমাধ্যম এবং এন্থনি মাসকারেনহাসের ” The Rape of Bangladesh” বই থেকে সংগৃহিত ,সম্পাদিত মৌলিক একটি লিখা। //

মুহাম্মদ ইরফান উদ্দীন
উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা
৩৭ তম বিসিএস নন-ক্যাডার

Share :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!