বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে পরাশক্তি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভুমিকা

১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে এমন অনুধাবন থেকেই বৃহৎ শক্তিবর্গ তাদের নিজ নিজ স্বার্থ রক্ষার্থে কেউ বাংলাদেশের মুক্তি সংগ্রামের পক্ষে, আবার কেউ বিপক্ষে অবস্থান গ্রহণ ও ভূমিকা পালন করে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র পাকিস্তানের সঙ্গে মৈত্রী রক্ষা এবং এ অঞ্চলে সোভিয়েত ইউনিয়নের আধিপত্য প্রতিহত করার জন্য পাকিস্তানের পক্ষাবলম্বন করে। চীনও পাকিস্তানের সঙ্গে মৈত্রী রক্ষার্থে মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানকে সমর্থন দেয়। এ যুদ্ধে পরাশক্তি হিসেবে সোভিয়েত ইউনিয়ন প্রথম প্রকাশ্যে বাংলাদেশের পক্ষাবলম্বন করে পূর্ব পাকিস্তানে সামরিক অগ্রাসনের নিন্দা জানায়। এ লেখায় বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে বৃহৎ শক্তিবর্গ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা তুলে ধরা হলো।

ঐতিহাসিক বন্ধুত্ব পাকিস্তান-যুক্তরাষ্ট্রঃ
১৯৫৩ সালে যুক্তরাষ্ট্র পাকিস্তানের সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করে। ১৯৫৪ সালের ১৯ মে করাচিতে পাকিস্তান ও যুক্তরাষ্ট্র একটি সাহায্য ও নিরাপত্তা চুক্তি স্বাক্ষর করে। এছাড়া সমাজতন্ত্রের বিস্তার রোধ করার জন্য যুক্তরাষ্ট্র এশিয়া ও দক্ষিণ পূর্ব এশিয়াকে কেন্দ্র করে ১৯৫৪ ও ১৯৫৫ সালে সিয়াটো ও সেন্টো নামে দুটি প্রতিরক্ষা চুক্তি তথা মৈত্রী জোট গঠন করে। এ মৈত্রী জোট দুটির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সদস্য ছিল পাকিস্তান। সেই চুক্তির ফলে পাকিস্তানের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের ভাল সম্পর্ক ছিল। অন্যদিকে ভারত একাত্তরে সোভিয়েত ইউনিয়নের সাথে জোটে স্বাক্ষর করে যা দক্ষিণ এশিয়ায় শক্তি প্রয়োগের জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে জন্য ঝুঁকি ও বাধা ছিল। ফলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বস্ত বন্ধুর সন্ধান করছিল যা মধ্য প্রাচ্যের মুসলিম দেশগুলিকে নিয়ন্ত্রণের জন্য সাহায্য করবে । একটি মুসলিম দেশ হিসাবে পাকিস্তানের তাদের স্বয়ংক্রিয় পছন্দ ছিল।

চীন এর সাথে সম্পর্ক স্থাপনে মিডিয়া পাকিস্থানঃ
ভিয়েতনাম যুদ্ধে পরাজিত হওয়ার পরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র চীনের সাথে সম্পর্ক পুনর্নির্মাণে আগ্রহী ছিল।১৯৪৯ সালে কমিউনিস্ট বিপ্লবের কারণে ওয়াশিংটন চীনের সাথে সমস্ত সম্পর্ক ছিন্ন করে দিয়েছিল। দক্ষিণ ও দক্ষিণ পূর্ব এশিয়াতে এবং চীনের সাথে সম্পর্ক পুনর্নির্মাণে পাকিস্তান ছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্বস্ত মিডিয়া । নিক্সনের অনুরোধে চীন ও আমেরিকার ভেতর গোপন দূতিয়ালির দায়িত্ব পেয়েছিলেন পাকিস্তানের সামরিক শাসক ইয়াহিয়া খান। তাই প্রেসিডেন্ট নিক্সন সর্বদা উচ্চ অগ্রাধিকার দেন পাকিস্তানকে।

নাটের গুরু হেনরি কিসিঞ্জারঃ

দক্ষিণ এশিয়ার মার্কিন নীতির বিষয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে অবাক করে দেয় যখন ১৯৭১ এর ৯ই আগস্ট ভারত- সোভিয়েত মৈত্রী চুক্তি স্বাক্ষরিত হয় । এটি যুক্তরাষ্ট্রের জন্য হুমকিতে পরিণত হয়েছিল। ফলস্বরূপ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র পাকিস্তানকে সহায়তা করেছিল । নিক্সন সরকার এর মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে হেনরি আলফ্রেড কিসিঞ্জার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। তার অংশ হিসাবে ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে নীতি নির্ধারণের জন্য তিনি প্রধান ভুমিকায় ছিলেন। পূর্ব পাকিস্তান সঙ্কটের সমাধান হিসাবে কিসিঞ্জার উপস্থাপন করেছিলেন নিক্সনের কাছে কয়েকটি প্রস্তাব।
১। ইয়াহিয়া সরকার গৃহীত পূর্ব পাকিস্তানে সামরিক পদক্ষেপ সহ – সম্পূর্ণ পাকিস্তান কে সমর্থন ।
২। পাকিস্তানের অর্থনৈতিক ও সামরিক সহায়তা।
৩। ক্ষতিগ্রস্থ এবং শরণার্থীদের জন্য পূর্ব পাকিস্তান এবং ভারতের জন্য সহায়তা প্রেরণ।
এতে প্রেসিডেন্ট নিক্সন পশ্চিম পাকিস্তানের পক্ষে সমর্থন দিয়েছেন এবং এর সাথে পূর্ব পাকিস্তানে ও মানবিক সহায়তা প্রেরণ করেছিলেন। প্রেসিডেন্ট নিক্সনের প্রশাসন নীতি শুরু থেকেই পাকিস্তানের দিকে ঝুঁকছিল তবে তার প্রশাসন দাবি করেছে যে ভারত এবং পাকিস্তানের জন্য আমেরিকার নীতি সমান। আর্চার ব্লাড যুক্তি দিয়েছিল যে এটি যদি সত্য হয় তবে ভারত পাকিস্তান সমান সমর্থন প্রাপ্য নয়। আর্চার ব্লাড ১৯৭১ সালে ঢাকায় মার্কিন কনসাল জেনারেল ছিলেন। তিনি বাংলাদেশের পরিস্থিতি সম্পর্কে ঘন ঘন অবহিত করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, “পূর্ব পাকিস্তানের সাম্প্রতিক ঘটনাবলি সম্পর্কিত মার্কিন নীতি কে নৈতিকভাবে সমর্থন করেন না। বিশ জন অফিসার বাংলাদেশ সঙ্কটের জন্য মার্কিন নীতির বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন

মাকিন মুলুকের রাজনীতিবিদিদের সমালোচনা ও অস্ত্র সরবারহঃ

মার্কিন রাজনীতিবিদরা বিশেষত বেশ কয়েকজন সিনেটর এবং কংগ্রেসের সদস্যরা সরকারের সমালোচনা করেছিলেন বাংলাদেশের নীতি (পূর্ব পাকিস্তান) ইস্যুতে । সিনেটর এডওয়ার্ড কেনেডি মার্কিন সরকারকে পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য বলেছিলেন কারণ আমেরিকার অস্ত্র ব্যবহার করে পূর্ব পাকিস্তানে গণহত্যা চলছিল ।দশজন সিনেটর পূর্ব পাকিস্তানে ত্রাণ প্রেরণ করার জন্য অনুরোধ করেছিলেন। আমেরিকান গণমাধ্যম সরকারের সমালোচনা শুরু করেছিল কারণ আমেরিকানদের অস্ত্র ব্যবহার করে বাংলাদেশী মানুষ মারা গিয়েছিল।তারা ত অস্ত্র দিয়েছেই বরং ১৯৭১ সালের অক্টোবরে ৭৪৮ টি জেট এয়ারলাইনস পাকিস্তানে প্রেরণ করা হয়েছিল সৌদি আরব থেকে যার মধ্যস্থতাকারী যুক্তরাষ্ট্র।
ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ শুরুঃ

ভারত ও সোভিয়েত ইউনিয়নের মৈত্রী চুক্তির প্রতিপক্ষ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যকার সম্পর্কের উন্নয়ন হয়। এ সময় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এ সমস্যার কূটনৈতিক সমাধানের ওপর গুরুত্বারোপ করে এবং ভারতকে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপ না গ্রহণ করার জন্য আহ্বান জানায়।সেপ্টেম্বরের শেষ দিক থেকে ডিসেম্বরের ৩ তারিখ পর্যন্ত ভারতীয় সেনা সদস্যরা বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে। এ সময় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র পাকিস্তানের সামরিক সরকার ও বাংলাদেশের জাতীয় নেতৃবৃন্দের (যারা ভারত অবস্থান করেছিলেন) মধ্যে গঠনমূলক একটি রাজনৈতিক সংলাপ আয়োজনের চেষ্টা করে। কিন্তু তা ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়। ৩ ডিসেম্বর থেকে শুরু করে ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত এ সময়ে বাংলাদেশের যুদ্ধ উপমহাদেশে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ হিসেবে পরিচিত লাভ করে।
জাতিসংঘ কে ব্যবহারঃ

৪ঠা ডিসেম্বর ওয়াশিংটনে হেনরি কিসিঞ্জার নিরাপত্তা পরিষদের আহুত অধিবেশনে যুদ্ধবিরতি ও সৈন্য প্রত্যাহারের দাবি সম্বলিত মার্কিন প্রস্তাব পেশ করার প্রস্তুতি নেন। নিরাপত্তা পরিষদের অধিবেশন শুরু হবার পর মার্কিন প্রতিনিধি জর্জ এইচ ডব্লিউ বুশ অবিলম্বে যুদ্ধবিরতি ঘোষণা, ভারত ও পাকিস্তানের সৈন্য স্ব-স্ব সীমান্তের ভেতরে ফিরিয়ে নেয়া এবং সেই সিদ্ধান্ত কার্যকর করার উদ্দেশ্যে জাতিসংঘ মহাসচিবকে ক্ষমতা প্রদান করার জন্য একটি প্রস্তাব উত্থাপন করেন। সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেটো প্রয়োগ করেন। । পরদিন ৫ই ডিসেম্বরে নিরাপত্তা পরিষদের পুনরায় শুরু হওয়া অধিবেশনে সোভিয়েত ইউনিয়নের এক প্রস্তাবে বলা হয় পূর্ব পাকিস্তানে এমন এক ‘রাজনৈতিক নিষ্পত্তি’ প্রয়োজন যার ফলে বর্তমান সংঘর্ষের অবসান নিশ্চিতভাবেই ঘটবে এবং পাকিস্তানি বাহিনীর সহিংসতার দরুন যে পরিস্থিতির অবনতি ঘটেছে তাও অবলিম্বে বন্ধ করা প্রয়োজন। একমাত্র পোল্যান্ড প্রস্তাবটি সমর্থন করে। চীন ভোট দেয় বিপক্ষে। ঐ দিন আরও আটটি দেশের পক্ষ থেকে যুদ্ধবিরতি ও সৈন্য প্রত্যাহারের পক্ষে নিরাপত্তা পরিষদে আরও একটি প্রস্তাব উত্থাপিত হয়। এবার সোভিয়েত ইউনিয়ন দ্বিতীয়বারের মত ভেটো প্রয়োগ করে।

সর্বশেষ অস্ত্র ব্যবহার (নৌ কূটনীতি)ঃ
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যখন দেখল যে, জাতিসংঘের মাধ্যমে যুদ্ধবিরতি ও সৈন্য প্রত্যাহার করা যাচ্ছে না তখন তারা নৌ কূটনীতির আশ্রয় নেয়। দেশটির উদ্দেশ্য ছিল- ভারতকে যুদ্ধবিরতি মানতে বাধ্য করা, পাকিস্তানকে রক্ষা করা, মুক্তিযুদ্ধকে ধ্বংস করা।প্রেসিডেন্ট নিক্সন ‘সপ্তম নৌবহর’কে ভিয়েতনাম থেকে বঙ্গোপসাগরের দিকে রওনা হওয়ার আদেশ দিলেন। বাংলাদেশের অভ্যুদয়কে নস্যাৎ করার পাশাপাশি বঙ্গোপসাগরে ‘সপ্তম নৌবহর’ পাঠানোর নির্দেশ ভারতের জন্যও স্পষ্ট সতর্কবার্তা।সোভিয়েত ইউনিয়ন তাদের ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলের নৌবহরের শক্তি বৃদ্ধির জন্যে সোভিয়েত পূর্ব উপকূল থেকে পাঁচটি সাবমেরিনসহ মোট ১৬টি যুদ্ধ ও সরবরাহ জাহাজ বঙ্গোপসাগরে জমায়েত করে।পাশাপাশি চীনের এই যুদ্ধে পাকিস্তানের মিত্র হিসেবে জড়িয়ে পড়ার সমূহ সম্ভাবনাকে সামনে রেখে সিংকিয়াং সীমান্তেও সৈন্য জমায়েত করা হয়।
পারমাণবিক শক্তিধর দুই রাষ্ট্র আমেরিকা আর সোভিয়েত ইউনিয়ন যদি সরাসরি যুদ্ধে জড়িয়ে যায় ব্যাপারটি যে কোথায় গিয়ে ঠেকবে সেই ব্যাপারে ভালোই ধারণা ছিলো চীনের। চীন ডিসেম্বরের ১২ তারিখ আমেরিকাকে জানিয়ে দেয় উপমহাদেশে কোনোরূপ সামরিক হস্তক্ষেপে তারা উৎসাহী না। বরং নিরাপত্তা পরিষদের অধিবেশনে এই নিয়ে আবারো আলোচনা করতে আগ্রহী তারা। চীনের এই সিদ্ধান্তের ফলে আমেরিকা হঠাৎ করেই পিছিয়ে যায়। সপ্তম নৌবহর তখন বঙ্গোপসাগর থেকে ২৪ ঘণ্টার দূরত্বে মালাক্কা প্রণালীতে। পরবর্তী সিদ্ধান্তের আগপর্যন্ত সেখানেই অবস্থান করতে বলা হয়ে এই নৌবহরকে।

উপসংহারঃ
এইভাবে বিভিন্ন কৌশলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরোধিতা করে। কিন্তু বাংলার মুক্তিকামী জনগনের অপরিসীম সাহসিকতায় অর্জিত হয় মহান স্বাধীনতা। আমরা পেয়ে যায় লাল সবুজের দেশ বাংলাদেশ । 🇧🇩🇧🇩🇧🇩🇧🇩🇧🇩🇧🇩🇧🇩

//কোন সাজেশান থাকলে কমেন্টে জানাবেন।

সুত্রঃ ১। বিভিন্ন আন্তুর্জাতিক গনমাধ্যম ,ব্লগ পত্রিকা , বই ,জার্নাল থেকে সংগৃহিত , অনুদিত,সম্পাদিত একটি মৌলিক লিখা। //

মুহাম্মদ ইরফান উদ্দীন
উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা
৩৭ তম বিসিএস নন-ক্যাডার

Share :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!