সংবিধানের দ্বাদশ সংশোধনী

বাংলাদেশের সাংবিধানিক বিকাশের ইতিহাসে সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে খ্যাত এই সংশোধনী আইন পাস হয় ১৯৯১ সালের ৬ আগস্ট। এর দ্বারা সংবিধানের ৪৮, ৫৫, ৫৬, ৫৮, ৫৯, ৬০, ৭০, ৭২. ১০৯, ১১৯, ১২৪, ১৪১ক এবং ১৪২ অনুচ্ছেদ সংশোধন করা হয় । বাংলাদেশ সংসদের পঞ্চম ও সপ্তম সংসদে বিরোধীদলের আসন ছিল উল্লেখযোগ্য,যেখানে বিরোধী দল শক্তিশালী ভাবে আচরণ করতে পেরেছে। পঞ্চম সংসদে দ্বাদশ সংশোধনী পাস হয়। প্রশ্নাতীত ভাবে বিতর্কের ঊর্ধে থেকে সরকারি ও বিরোধী দলের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় পাশ হয় এ সংশোধনী। দ্বাদশ সংশোধনী উত্থাপন করা হয় ২ জুলাই, ১৯৯১। যেহেতু বিলটি তে সংবিধানের ৪৮,৫৬ ও ১৪২ অনুচ্ছেদের বিধানবলী সংশোধনের প্রস্তাব ছিল সুতরাং রাষ্ট্রপতি বিলটিকে ১৪২(৬) অনুচ্ছেদের বিধানবলে গনভোটে পেশ করেন।( ১৫ তম সংশোধনী তে এই গনভোটের বিধান বাতিল করা হয় ) ।১৯৯১ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর গনভোট অনুষ্টিত হয় । গনভোটে প্রদত্ত ভোটের ৮৪.৩৮ % বিলের পক্ষে পড়ে । ফলে অইদিন ই ১৪২(১ গ) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী বিলটি রাষ্ট্রপতির সম্মতি লাভ করেছে বলে ধরা হয় এবং বিলটি দ্বাদশ সংশোধনী আইনে পরিণত হয় ।

দ্বাদশ সংশোধনী মাধ্যমে বাংলাদেশের সংবিধানে নিম্নলিখিত মৌলিক পরিবর্তন আনয়ন করা হয় যা আসলে ৭২ এর সংবিধানের অনেকগুলো অনুচ্ছেদ কে পুনর্বহাল করে। নিম্নে তা আলোচনা করা হলঃ
ক) এই সংশোধনীর মাধ্যমে বাংলাদেশে সংসদীয় সরকার পদ্ধতির পুনঃপ্রবর্তন ঘটে। রাষ্ট্রপতিকে রাষ্ট্রের নাম সর্বস্ব করা হয় এবং সকল নির্বাহী ক্ষমতার প্রকৃত মালিক হয় মন্ত্রিপরিষদ যার নেতৃত্বে থাকবেন প্রধাননমন্ত্রী। মন্ত্রিগন যৌথভাবে সং সদের নিকট দায়ী থাকবেন। (অনু ৫৫ও ৫৬) ।

খ) রাষ্ট্রপতির পদমর্যাদাঃ
রাষ্ট্রপতির পদমর্যাদা সম্পর্কিত নিম্নোক্ত বিধান সংশোধন করে সংযুক্ত করা হয় ।
১। এই সংশোধনীতে বিধান করা হয় যে বাংলাদেশের একজন রাষ্ট্রপতি থাকিবেন, যিনি আইন অনুযায়ী সংসদ-সদস্যগণ কর্তৃক নির্বাচিত হইবেন।(অনু ৪৮) ।
২। এই পদের মেয়াদ ৫ বছর করা হয় । (অনু ৫০(১)) একাদিক্রমে হউক বা না হউক-দুই মেয়াদের অধিক রাষ্ট্রপতির পদে কোন ব্যক্তি অধিষ্ঠিত থাকিবেন না এটিও সংযোজন করা হয় । (অনু ৫০(২) ।
৩। এই সংবিধানের ৫৬ অনুচ্ছেদের (৩) দফা অনুসারে কেবল প্রধানমন্ত্রী ও ৯৫ অনুচ্ছেদের (১) দফা অনুসারে প্রধান বিচারপতি নিয়োগের ক্ষেত্র ব্যতীত রাষ্টপতি তাঁহার অন্য সকল দায়িত্ব পালনে প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ অনুযায়ী কার্য করিবেন এই বিধান সংযুক্ত করা হয় । (অনু ৪৮)
৪। প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ অনুযায়ী সরকারী বিজ্ঞপ্তি-দ্বারা রাষ্ট্রপতি সংসদ আহ্বান, স্থগিত ও ভঙ্গ করিবেন এবং সংসদ আহ্বানকালে রাষ্ট্রপতি প্রথম বৈঠকের সময় ও স্থান নির্ধারণ করিবেন এই বিধান সংযোজন করা হয় ( অনু ৭২) ।
৫। জরুরী অবস্থা ঘোষণার বৈধতার জন্য ঘোষণার পূর্বেই প্রধানমন্ত্রীর প্রতি-স্বাক্ষর প্রয়োজন হইবে এই বিধান সংযোজন করা হয় । (অনু ১৪১ ক )
৬।উপরাষ্ট্রপতির পদ বিলোপ করা হয় ।বিধান করা হয় যে , রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হইলে কিংবা অনুপস্থিতি, অসুস্থতা বা অন্য কোন কারণে রাষ্ট্রপতি দায়িত্ব পালনে অসমর্থ হইলে ক্ষেত্রমত রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত না হওয়া পর্যন্ত কিংবা রাষ্ট্রপতি পুনরায় স্বীয় কার্যভার গ্রহণ না করা পর্যন্ত স্পীকার রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করিবেন।

গ)প্রধানমন্ত্রী ও তার মন্ত্রিসভাঃ
প্রধানমন্ত্রীর পদমর্যাদা সম্পর্কিত নিম্নোক্ত বিধান সংশোধন করে সংযুক্ত করা হয় ।

১। এই সংশোধনীর মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী হন রাষ্ট্রের প্রধান নির্বাহী; প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে মন্ত্রিপরিষদ জাতীয় সংসদের কাছে দায়বদ্ধ হয়। [অনু ৫৫(২)]
২। যে সংসদ-সদস্য সংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের আস্থাভাজন বলিয়া রাষ্ট্রপতির নিকট প্রতীয়মান হইবেন, রাষ্ট্রপতি তাঁহাকে প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ করিবেন এরুপ বিধান করা হয় ।[(অনুঃ৫৬)]
৩। মন্ত্রীদের সংখ্যার অন্যূন নয়-দশমাংশ সংসদ-সদস্যগণের মধ্য হইতে নিযুক্ত হইবেন এবং অনধিক এক-দশমাংশ সংসদ-সদস্য নির্বাচিত হইবার যোগ্য ব্যক্তিগণের মধ্য হইতে মনোনীত হইতে পারিবেন। এরুপ বিধান ও করা হয় ।
৪। সংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের সমর্থন হারাইলে প্রধানমন্ত্রী পদত্যাগ করিবেন কিংবা সংসদ ভাংগিয়া দিবার জন্য লিখিতভাবে রাষ্ট্রপতিকে পরামর্শদান করিবেন এবং তিনি অনুরূপ পরামর্শদান করিলে রাষ্ট্রপতি, অন্য কোন সংসদ-সদস্য সংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের আস্থাভাজন নহেন এই মর্মে সন্তুষ্ট হইলে, সংসদ ভাংগিয়া দিবেন। [অনুঃ ৫৭(২) এর এই বিধান সংযুক্ত করা হয়]

ঘ) ৭০ নং অনুচ্ছেদ সংযোজনঃ
এই সংশোধনী অনুসারে জাতীয় সংসদের কোনো সদস্য দল ত্যাগ করা নিয়ে সংবিধানের নিম্নলিখিত ৭০ অনুচ্ছেদে সংযুক্ত করা হয় ।
কোনো রাজনৈতিক দলের মনোনীত প্রার্থী হিসেবে সংসদ-সদস্য নির্বাচিত হয়ে তিনি যদি সেই দল থেকে পদত্যাগ করেন
বা দলের বিপক্ষে ভোট দেন
অথবা দলের নির্দেশ অমান্য করে সংসদে অনুপস্থিত থাকেন
বা ভোটদানে বিরত থাকেন,
তবে তাঁর সদস্যপদ বাতিল হয়ে যায়।

ঙ) সংসদের এক অধিবেশনের সমাপ্তি ও পরবর্তী অধিবেশনের প্রথম বৈঠকের মধ্যে ৬০ দিনের বেশি বিরতি না থাকার বিধান সংযোজন করা হয় । [অনুঃ ৭২]
চ) স্থানীয় শাসন সংক্রান্ত অনুচ্ছেদ ৫৯ ও ৬০ পুনঃসংযোজন করা হয় ।
ছ) বিদেশের সহিত সম্পাদিত সকল চুক্তি রাষ্ট্রপতির নিকট পেশ করা হইবে, এবং রাষ্ট্রপতি তাহা সংসদে পেশ করিবার ব্যবস্থা করিবেন এই বিধান সংযুক্ত করা হয় । [১৪৫ক অনুচ্ছেদ]
————————————————————————–

★কোন সাজেশান থাকলে কমেন্টে জানাবেন
সূত্রঃ বিভিন্ন গণমাধ্যম,ব্লগ,সাংবিধানিক রাজনীতির বই থেকে সংগৃহীত, সম্পাদিত ,সংক্ষেপিত একটি মৌলিক লেখা। ।

মুহাম্মদ ইরফান উদ্দীন
উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা
৩৭ তম বিসিএস নন-ক্যাডার

Share :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!