সংবিধানের প্রশাসনিক ট্রাইব্যুনাল এর বিধান সম্বলিত ১১৭ নং অনুচ্ছেদনামাঃ

প্রশাসনিক ট্রাইব্যুনাল প্রজাতন্ত্রের কোন বিষয় অথবা কোন সংবিধিবদ্ধ সংস্থায় উদ্ভূত বিষয় নিষ্পত্তি বা বিচারের দায়িত্বপ্রাপ্ত সালিস-সভা। একদিকে রাষ্ট্রের নির্বাহী প্রতিষ্ঠান ও আমলাদের এবং অন্যদিকে বেসরকারি সংস্থা ও নাগরিকদের মধ্যকার সৃষ্ট বিরোধ প্রশাসনিকভাবে বিচার-নিষ্পত্তির অনুশীলনের ধারণা থেকেই প্রশাসনিক ট্রাইব্যুনালের উদ্ভব। ১৯৪৭ সালের ক্রাউন প্রসিডিংস অ্যাক্ট-এর ভিত্তিতেই ব্রিটিশ আমলে প্রশাসনিক ট্রাইব্যুনাল গড়ে উঠেছিল। এ সব ট্রাইব্যুনালের আওতায় ছিল সাধারণত কতিপয় সুনির্দিষ্ট বিষয়, যেমন সামাজিক নিরাপত্তা, শিশুসদনের নিবন্ধন, স্থানীয় করব্যবস্থা ইত্যাদি। যুক্তরাষ্ট্রেও বিরোধ নিস্পত্তির জন্য বিশেষ কমিশন রয়েছে, যেমন ইন্টার-স্টেট কমার্স কমিশন, ফেডারেল ট্রেড কমিশন ইত্যাদি। ফ্রান্সেই রয়েছে সবচেয়ে শক্তিশালী ধরনের প্রশাসনিক ট্রাইব্যুনাল। একে বলা হয় কাউন্সিল অব স্টেট সিস্টেম। বিভিন্ন দেশে ভিন্ন ভিন্ন নামে প্রশাসনিক ট্রাইব্যুনাল বিদ্যমান।
বাংলাদেশ সংবিধানের এ সংক্রান্ত বিধানঃ
বাংলাদেশ সংবিধানের ১১৭ অনুচ্ছেদে প্রশাসনিক ট্রাইব্যুনালের বিধান রাখা হয়েছে। তা নিম্নে বর্ণনা করা হলঃ
১১৭। (১) ইতঃপূর্বে যাহা বলা হইয়াছে, তাহা সত্ত্বেও নিম্নলিখিত ক্ষেত্রসমুহ সম্পর্কে বা ক্ষেত্রসমুহ হইতে উদ্ভূত বিষয়াদির উপর এখতিয়ার প্রয়োগের জন্য সংসদ আইনের দ্বারা এক বা একাধিক প্রশাসনিক ট্রাইব্যুনাল প্রতিষ্ঠিত করিতে পারিবেন-
(ক) নবম ভাগে বর্ণিত বিষয়াদি এবং অর্থদণ্ড বা অন্য দণ্ডসহ প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিযুক্ত ব্যক্তিদের কর্মের শর্তাবলী;
(খ) যে কোন রাষ্ট্রায়ত্ত উদ্যোগ বা সংবিধিবদ্ধ সরকারী কর্তৃপক্ষের চালনা ও ব্যবস্থাপনা এবং অনুরূপ উদ্যোগ বা সংবিধিবদ্ধ সরকারী কর্তৃপক্ষে কর্মসহ কোন আইনের দ্বারা বা অধীন সরকারের উপর ন্যস্ত বা সরকারের দ্বারা পরিচালিত কোন সম্পত্তির অর্জন, প্রশাসন, ব্যবস্থাপনা ও বিলি-ব্যবস্থা;
(গ) যে আইনের উপর এই সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদের [ (৩)] দফা প্রযোজ্য হয়, সেইরূপ কোন আইন।
(২) কোন ক্ষেত্রে এই অনুচ্ছেদের অধীন কোন প্রশাসনিক ট্রাইব্যুনাল প্রতিষ্ঠিত হইলে অনুরূপ ট্রাইব্যুনালের এখতিয়ারের অন্তর্গত কোন বিষয়ে অন্য কোন আদালত কোনরূপ কার্যধারা গ্রহণ করিবেন না বা কোন আদেশ প্রদান করিবেন না:
তবে শর্ত থাকে যে, সংসদ আইনের দ্বারা কোন ট্রাইব্যুনালের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা বা অনুরূপ সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপীলের বিধান করিতে পারিবেন।
অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ ট্রাইব্যুনালস অ্যাক্ট ১৯৮০ এর উল্লেখযোগ্য দিকসমুহঃ –
অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ ট্রাইব্যুনালস অ্যাক্ট ১৯৮০ (১৯৮১ সালের অ্যাক্ট-৭) বলে বাংলাদেশে প্রশাসনিক ট্রাইব্যুনাল গঠিত হয়। এ আইনের সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য হলো প্রজাতন্ত্রের চাকুরিতে নিয়োজিত ব্যক্তির চাকুরির শর্ত সম্পর্কিত বিষয়ে বিচারের জন্য ট্রাইব্যুনাল গঠন করা। এ আইনে বলা হয়েছে,
১। যখন সরকার এক বা একাধিক প্রশাসনিক ট্রাইব্যুনাল গঠন করবে, তখন প্রত্যেকটি ট্রাইব্যুনালের সুনির্দিষ্ট আওতা নির্ধারণ করে দিতে হবে। এক সদস্যবিশিষ্ট এই ট্রাইব্যুনালের সদস্য সরকার কর্তৃক জেলা জজদের মধ্য থেকে নিয়োগপ্রাপ্ত হবেন। ট্রাইব্যুনালের সদস্যের নিয়োগের শর্তাবলি সরকার কর্তৃক নির্ধারিত হবে।
২। প্রজাতন্ত্রের চাকুরিতে নিয়োজিত কোন ব্যক্তির চাকুরির শর্তাবলি পেনশনের অধিকার সংক্রান্ত আবেদন গ্রহণ ও তৎসম্পর্কে সিদ্ধান্ত দেওয়ার সুস্পষ্ট এখতিয়ার প্রশাসনিক ট্রাইব্যুনালের রয়েছে।
৩। প্রজাতন্ত্রের চাকুরিতে নিয়োজিত কোনো ব্যাক্তি সম্পর্কে তার কর্তৃপক্ষ কর্তৃক গৃহীত যেকোন পদক্ষেপের বিরুদ্ধে তার আবেদনও ট্রাইব্যুনাল বিবেচনা করতে পারে। অবশ্য আইনি শর্ত হলো, আবেদনকারীকে তার সম্পর্কে গৃহীত যেকোন ব্যবস্থা বা আদেশে সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি হতে হবে।
৪। সংক্ষুদ্ধ ব্যক্তির ঊর্ধ্বতন কোন প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষ কর্তৃক গৃহীত ব্যবস্থা বা আদেশ বাতিল, পরিবর্তন বা সংশোধনের সুযোগ থাকলে সেক্ষেত্রে বিষয়টি সম্পর্কে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ কোন সিদ্ধান্ত না নেওয়া পর্যন্ত প্রশাসনিক ট্রাইব্যুনাল কর্তৃক এ ধরনের কোন আবেদন গ্রহণযোগ্য হবে না। প্রশাসনিক ট্রাইব্যুনালে এ ধরনের অভিযোগের প্রতিকার চেয়ে আবেদন করার সময়সীমাও বেঁধে দেওয়া আছে। যথার্থ প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষ কর্তৃক কোন ব্যবস্থা বা আদেশ প্রদানের তারিখ থেকে ৬ মাস পর্যন্ত এ সময়সীমা নির্ধারিত।
৫। এডমিনিস্ট্রেটিভ ট্রাইব্যুনাল আক্টে একটি প্রশাসনিক আপীল ট্রাইব্যুনালেরও বিধান রাখা হয়েছে। সরকার কর্তৃক নিয়োগকৃত একজন চেয়ারম্যান ও অপর দুজন সদস্য নিয়ে আপীল ট্রাইব্যুনাল গঠিত হবে। নিয়োগের জন্য চেয়ারম্যান ও সদস্যদের যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতা সম্পর্কেও এ আইনে বলা হয়েছে।
৬। প্রশাসনিক ট্রাইব্যুনালের কোন আদেশ বা সিদ্ধান্ত সম্পর্কে আপীল শুনানী এবং সিদ্ধান্ত প্রদানের বিষয় আপীল ট্রাইব্যুনালের এখতিয়ারভুক্ত।
বর্তমানে দুটি প্রশাসনিক ট্রাইব্যুনাল রয়েছে, একটি ঢাকায় এবং অপরটি বগুড়ায়। এছাড়া আরও কিছু ট্রাইব্যুনাল ও বিশেষ কমিশন রয়েছে, যেমন ইনকাম ট্যাক্স ট্রাইব্যুনাল, সিকিউরিটিস একচেঞ্জ কমিশন এবং ট্যাক্সেস সেটেলমেন্ট কমিশন। এছাড়াও করদাতাদের আপত্তি নিষ্পত্তির জন্য রয়েছেন পৃথক ন্যায়পাল।
————————————————————————–

★কোন সাজেশান থাকলে কমেন্টে জানাবেন

সূত্রঃ বিভিন্ন গণমাধ্যম,বাংলাপিডিয়া ,সাংবিধানিক রাজনীতির বই থেকে সংগৃহীত, সম্পাদিত ,সংক্ষেপিত একটি লেখা। ।

মুহাম্মদ ইরফান উদ্দীন
উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা
৩৭ তম বিসিএস নন-ক্যাডার

Share :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!