সংবিধানের রাষ্ট্র পরিচালনার মুলনীতির বিস্তারিত

১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পর ঠিক এক বছর পর বাংলাদেশের সংবিধান কার্যকর হয়। ১৯৭২ সালের সংবিধানে রাষ্ট্রপরিচালনার মূলনীতি হিসেবে জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতাকে লিপিবদ্ধ করা হয়। কিন্তু সংবিধানের ৫ম সংশোধনীর মাধ্যমে এ মূলনীতির কিছু কিছু ধারায় পরিবর্তন করে আনে সামরিক সরকার। আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে লিখিত সংবিধানের অন্যতম অলংকার হলো রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতির সংযোজন। যে কোনো গণতান্ত্রিক সরকারের অন্যতম লক্ষ হলো জনসাধারণকে সর্বাধিক নাগরিক সেবা প্রদান করা। যেহেতু রাষ্ট্রের পুলিশি ভূমিকা এখন আর নেই, সে কারণে রাষ্ট্রনৈতিক গণতন্ত্রের সাথে সামাজিক ও অর্থনৈতিক গণতন্ত্রকে সম্মিলিতভাবে বাস্তবায়ন করে গণতন্ত্রকে সফল করাই আধুনিক রাষ্ট্রগুলোর প্রধান লক্ষ্য । সে কারণে আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলো তাদের সংবিধানে মৌলিক অধিকার সংযোজন করে আসছে। মূলনীতিগুলোর সামাজিক, নৈতিক, শিক্ষাগত এবং আইনগত গুরুত্ব রয়েছে। এ কারণে মূলনীতিগুলোকে National Manifesto ,Highest Standard of Excellence and Dcoration of Constitution বলা হয়ে থাকে।
বিভিন্ন দেশে মুলনীতিঃ
ইউরোপের দেশ আয়ারল্যান্ডের গণতান্ত্রিক সরকার ১৯৩৭ সালে তার নতুন সংবিধানে রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি সংযোজন করে। ব্রিটিশ শাসন থেকে বের হয়ে বার্মা (বর্তমান মায়ানমার) ১৯৪৮ সালে যে সংবিধান রচনা করে তাতেও রাষ্ট্রপরিচালনার মূলনীতি অন্তর্ভুক্ত করে। পাকিস্তানের গণপরিষদ সদস্যরাও তাদের সংবিধানে (১৯৫৬, ১৯৬২) রাষ্ট্রপরিচালনার মূলনীতি সংযোজন করে। বাংলাদেশ সংবিধানের ৮ম অনুচ্ছেদ থেকে ২৫ অনুচ্ছেদ পর্যন্ত — রাষ্ট্রপরিচালনার
মূলনীতির উল্লেখ রয়েছে।
মুলনীতি বাস্তবায়নের সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতাঃ
রাষ্ট্রপরিচালনার মূলনীতি বলতে আমরা সেসব নীতিকে বুঝি যা একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের সামাজিক, অর্থনৈতিক, প্রশাসনিক
এবং বৈদেশিক নীতি নির্ধারণে সহায়তা করে। রাষ্ট্রপরিচালনার মূলনীতিকে আবার কর্মসূচিগত অগ্রাধিকারও বলা হয়। কারণ
এগুলো সরকারের বিবিধ কর্মকান্ড পরিচালনার অনুপ্রেরণা ও দিক নির্দেশনা দেয়।রাষ্ট্রপরিচালনায় মূলনীতি অনুসরণের সাংবিধানিক নিশ্চয়তা নেই। অর্থাৎ মৌলিক অধিাকরের মতো এগুলোকে সাংবিধানিক নিশ্চয়তা দেয়া হয়নি। মূলনীতিগুলোর বাস্তবায়ন নির্ভর করে একটি রাষ্ট্রের জাতীয় সম্পদ, জনগণের মেধা এবং অর্থনৈতিক
সচ্ছলতার ওপর। সরকার এসব নীতি বাস্তবায়ন করে রাষ্ট্রের জনগণের কল্যাণ সাধন করার জন্য। সরকার এসব ক্ষেত্রে
পারদর্শিতা দেখাতে না পারলে সরকারের বিরুদ্ধে এগুলো বাস্তবায়নের জন্য মামলা করা যাবে না যেমনটি করা যায় মৌলিক অধিকারের ক্ষেত্রে । তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে সাধারণত সম্পদের অপর্যাপ্ততা এবং রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা দেখা যায়। সে কারণে সরকার রাষ্ট্রপরিচালনার মূলনীতি বাস্তবায়নে চেষ্টা করে কিন্তু বাস্তবায়নের গ্যারান্টি দেয় না। ।
রাষ্ট্রপরিচালনার মূলনীতির প্রয়োগক্ষেত্রঃ
বাংলাদেশ সংবিধানে উল্লিখিত রাষ্ট্রপরিচালনার মূলনীতিগুলো আলোচনার আগে এসব নীতি কোন্ কোন্ ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা
হবে তা আমাদের জানা দরকার।
সংবিধানের ৮(২) অনুচ্ছেদে রাষ্ট্রপরিচালনার মূলনীতিগুলো কোন্ কোন্ ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা হবে তা বলা হয়েছে। এতে বলা
হয়েছে;
ক. দেশ পরিচালনার ক্ষেত্রে মৌলিক সূত্র বলে গণ্য হবে;
খ. আইন প্রণয়নকালে প্রয়োগ হবে;
গ. সংবিধান ও অন্যান্য আইনের ক্ষেত্রে এই নীতিগুলো দিশারী, নির্দেশক তথা মানদন্ড হিসেবে ব্যবহৃত হবে; এবং
ঘ. রাষ্ট্র ও নাগরিকদের কার্যের ভিত্তি হবে সব নীতি।
রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতিসমুহঃ
বাংলাদেশের সংবিধানের দ্বিতীয় ভাগের অনুচ্ছেদ ৮ থেকে অনুচ্ছেদ ২৫ পর্যন্ত রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি আলোচনা করা হয়েছে। আমাদের সংবিধানে ধারাবাহিক ভাবে নিম্নোক্ত নীতিগুলোকে রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি হিসাবে গ্রহণ করা হয়েছে –
৮. মূলনীতিসমূহ ৯. জাতীয়তাবাদ ১০. সমাজতন্ত্র ও শোষণমুক্তি ১১.গণতন্ত্র ও মানবাধিকার ১২. ধর্মনিরপেক্ষতা ও ধর্মীয় স্বাধীনতা ১৩. মালিকানার নীতি ১৪. কৃষক ও শ্রমিকের মুক্তি ১৫. মৌলিক প্রয়োজনের ব্যবস্থা ১৬. গ্রামীণ উন্নয়ন ও কৃষিবিপ্লব ১৭. অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক শিক্ষা ১৮. জনস্বাস্থ্য ও নৈতিকতা ১৮(ক). পরিবেশ ও জীব-বৈচিত্র্য সংরক্ষণ ও উন্নয়ন ১৯. সুযোগের সমতা ২০. অধিকার ও কর্তব্যরূপে কর্ম ২১. নাগরিক ও সরকারী কর্মচারীদের কর্তব্য ২২. নির্বাহী বিভাগ হইতে বিচারবিভাগের পৃথকীকরণ ২৩. জাতীয় সংস্কৃতি ২৩ (ক) . উপজাতি, ক্ষুদ্রজাতিসত্তা, নৃ-গোষ্ঠী ও সম্প্রদায়ের সংস্কৃতি ২৪. জাতীয় স্মৃতি নিদর্শন, প্রভৃতি ২৫. আন্তর্জাতিক শান্তি, নিরাপত্তা ও সংহতির উন্নয়ন।
রাষ্ট্রপরিচালনার মূলনীতিতে যে পরিবর্তন আনা হয়ঃ
১৯৭২ সালের ১৬ ডিসেম্বর থেকে ১৯৭৯ সালের ফেব্রুয়ারি মাস পর্যন্ত — রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতির চারটি মৌলিক আদর্শে
কোনো পরিবর্তন আনা হয়নি। প্রেসিডেন্ট জেনারেল জিয়াউর রহমান ক্ষমতায় আসার পর ১৯৭৯ সালে চারটি মৌলিক আদর্শের তিনটিতে পরিবর্তন আনেন। এ বিষয়ে তিনি চতুর্থ ফরমান জারি করেন, যা পঞ্চম সংশোধনীতে পাস করা হয়।
সংশোধনী বা পরিবর্তনগুলো নিম্নরূপঃ
১. জাতীয়তাবাদ: ‘বাঙালি’ জাতীয়তাবাদের পরিবর্তে ‘বাংলাদেশী’ জাতীয়তাবাদ করা হয়।
২. সমাজতন্ত্র: সমাজতন্ত্রেও পরিবর্তন আনা হয়। এতে বলা হয় সমাজতন্ত্রের স্থানে হবে অর্থনৈতিক ও সামাজিক ন্যায়বিচার এই অর্থে সমাজতন্ত্র।
৩. ধর্মনিরপেক্ষতা: ‘ধর্মনিরপেক্ষতা শব্দটি পরিবর্তত হয়ে ‘সর্বশক্তিমান আল্লাহর উপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস’ প্রতিস্থাপিত হয়। সংবিধান থেকে ধর্মনিরপেক্ষতা বাদ দেওয়া হয়।
রাষ্ট্রপরিচালনার মূলনীতি পুনর্বহালঃ ১৫ তম সংশোধনীতে এই মুলনীতিসমুহ পুনর্বহাল করা হয় ।
রাষ্ট্রপরিচালনার মূলনীতির তাৎপর্যঃ
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সংবিধানে রাষ্ট্রপরিচালনার মূলনীতিতে রাষ্ট্রের দায়িত্বের পাশাপাশি নাগরিকদের কর্তব্যের কথাও বলা
হয়েছে। যদিও রাষ্ট্রপরিচালনার মূলনীতিগুলো রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক, সামাজিক, প্রশাসনিক এবং বৈদেশিক সম্পর্ক নির্ধারণের সাথে সম্পৃক্ত, তবুও এগুলোকে সাংবিধানিক নিশ্চয়তা দেয়া হয়নি। অবশ্য একেবারে অবহেলাও করা হয়নি। জাতীয় সংসদকে এ মূলনীতিগুলো কার্যকর করার ক্ষেত্রে যথেষ্ট স্বাধীনতা দেয়া হয়েছে। এ বিষয়ে ৪৭ অনুচ্ছেদে চমৎকার ব্যাখ্যা রয়েছে । সেখানে বলা হয়েছে, কোনো সম্পত্তির রাষ্ট্রীয়করণ, বাধ্যতামূলকভাবে গ্রহণ বা দখল, খনি সম্পর্কিত অধিকার বিলোপ বা নিয়ন্ত্রণ ইত্যাদি বিষয়ে সংসদ আইন প্রণয়ন করতে পারবে। তবে এই আইন প্রণয়ন বিষয়ে যদি উল্লেখ থাকে যে, রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতিসমূহের কোনো একটিকে কার্যকর করার জন্য আইন প্রণয়ন করা হয়েছে তবে উক্ত আইন মৌলিক অধিকারের পরিপন্থী হলেও বাতিল হবে না। সুতরাং ৪৭ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী আইনসভাকে মূলনীতি কার্যকর করার স্বাধীনতা দেয়া হয়েছে।
______________________________________________

★কোন সাজেশান থাকলে কমেন্টে জানাবেন

(সূত্রঃ বিভিন্ন গণমাধ্যম,ব্লগ,সাংবিধানিক রাজনীতির বই থেকে সংগৃহীত, সম্পাদিত ,সংক্ষেপিত একটি লেখা।

মুহাম্মদ ইরফান উদ্দীন
উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা
৩৭ তম বিসিএস নন-ক্যাডার

Share :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!